বাঙালির মহামিলন মেলা পহেলা বৈশাখ

0
193
বাঙালির মহামিলন মেলা পহেলা বৈশাখ
বাঙালির মহামিলন মেলা পহেলা বৈশাখ
Print Friendly, PDF & Email

এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনায় পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। তেমনি অনেক আগে থেকেই আসাম, বঙ্গ, কেরালা, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাডুএবং ত্রিপুরা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পালিত হত পহেলা বৈশাখ। তবে প্রাচীনকালে এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ।

সারা বিশ্বের বাঙালিরা এ দিনে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়,  ভুলে যাবার চেষ্টা করে অতীত বছরের সকল দুঃখ-গ্লানি। সবার কামনা থাকে যেন নতুন বছরটি সমৃদ্ধ ও সুখময় হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা একে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ হিসেবে বরণ করে নেয়।

নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় পরে এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। এইদিন বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পোশাক ধুতি-পাঞ্জাবি এবং শাড়ি পরার রেওয়াজ প্রচলিত। নতুন পোশাকে এ যেন রঙের খেলা।

কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকায়, কোন খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুটির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে।

‘বৈশাখের প্রথম জলে আশুধান দ্বিগুন ফলে’ অথবা ‘মাঘে মুখী, ফাল্গুনে চুখী, চৈত্রে লতা, বৈশাখে পাতা’- বৈশাখ নিয়ে খনার এইসব বচন আমাদের কাছে প্রাচীন বাংলাতেও বৈশাখের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। অতীতের সেই গুরুত্বপূর্ন বৈশাখের প্রথম দিন ‘পহেলা বৈশাখ’ নামে হয়ে উঠেছে আজ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহদাকার এবং জাতীয় উৎসব।

ষাট বা সত্তুরের দশকেও যে হালখাতা দেখা যেতো উৎসবের মতো করে, তা দিনে দিনে ফিকে হতে হতে প্রায় মিলিয়ে যেতে বসেছে। মূলত পহেলা বৈশাখ এখন আর কেবল হালখাতা নির্ভর অনুষ্ঠান নয়, বরং অনেক ব্যাপক, দূরসঞ্চারী এবং বহুমাত্রিকতায় পূর্ণ আমাদের অন্যতম জাতীয় উৎসব।

প্রায় প্রতি নববর্ষেই যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন মাত্রা, বৃদ্ধি পাচ্ছে জনসমাগম, এবং উৎসাহের জোয়ার। পাশ্চাত্যের বর্ষবরণের আদলে আমাদের দেশেও বর্তমানে কার্ড আদান প্রদানের মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময়, সংগীত-নৃত্যের মাধ্যমে প্রাণে গতিসঞ্চার এবং সর্বশেষ ফোন সংস্কৃতির মাধ্যমে ক্ষুদে বার্তা প্রেরণ ও ফেসবুকীয় শুভেচ্ছা বিনিময় এ ক্ষেত্রে নবতর ধারার সূচনা করেছে। তবে বিবর্তনের ধারায় আমাদের দেশের সংস্কৃতি মিশ্রসংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হলেও বাঙালির নিজস্বতা একেবারে বিলীন হয়নি। বাঙালীর বাঙালিয়ানায় কমতি আসেনি একটুও!

আজও পহেলা বৈশাখের সঙ্গে বাঙালির আদি সংস্কৃতি যেমন, যাত্রা ও পালা, কবিগান, গাজির গান, আলকাপ, পুতুল নাচ, বাউল-মুর্শিদি-ভাটিয়ালি গান, লাইলি-মজনু, রাধা-কৃষ্ণ, ইউসুফ-জুলেখা ইত্যাদি পালা প্রদর্শনের আয়োজন করা হয় প্রত্যন্ত গ্রামে। এই দিনের আরো আয়োজন একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে থাকে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তি।

নববর্ষ উৎসব পালনের ধরন নিয়ে অনেক বিরূপ মন্তব্যও শোনা যায়। কেউ কেউ এর মধ্যে বিজাতীয় বা বিধর্মীয় ঐতিহ্যের গন্ধ খুঁজে পান। কিন্তু যেভাবেই পালিত হোক, পহেলা বৈশাখ বাঙালীর ঐতিহ্যেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাঙালি তার জাতিসত্তাকে অনুভব করে, ফিরে আসে শেকড়ের কাছে এবং সমাবেত হয় মহামিলনের মেলায় বৈশাখ মাসের ১ তারিখে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। এই দিনে সবাই সবাইকে বিভিন্নভাবে শুভেচ্ছা জানায়। সবাইকে নববর্ষের অগ্রীম শুভেচ্ছা জানিয়ে রাখছি বাঙালিয়ানা পরিবারের পক্ষ থেকে। অতি আনন্দে কাটুক সবার পয়লা বৈশাখ এই শুভ কামনা রইল 🙂

আরও জানুন » নগ্নকান্তি »

Comments

comments