বাংলা ক্যালিগ্রাফি – স্বগত কথন

0
1266
Print Friendly, PDF & Email

খুব ছোট বেলায় হাতে লেখা পুঁথি আর দলিল লেখার ষ্টাইল আমাকে ভীষন প্রভাবিত করে। আমার দাদার হাতের লেখা ছিল খুব সুন্দর। স্কুল শিক্ষক দাদা ছিলেন মেধাবী, প্রাণবান ও ভীষন সৃষ্টিশীল। বিচিত্র কাজে সবসময় তাঁকে ব্যস্ত থাকতে দেখতাম। তিনি দলিল লিখতেন, নিরক্ষর লোকদের চিঠি লিখে দিতেন। কাঁচা কিংবা পাকা  ঘরবাড়ি আসবাবের নকশা করতেন। মৃত্যুর বেশ আগেই নিজের কবরের ডিজাইন ও নির্মাণসম্পন্ন করে রেখেছিলেন। ১৯৫০ সালে জাহাজে করে হজ্জ্বে গিয়ে রুট ম্যাপ সহ তাঁর আঁকা মক্কা মদিনার গুরুত্বপূর্ণস্থাপনাগুলোর ছবি আমাকে বেশ প্রভাবিত করেছিল।


আমার আব্বার হাতের লিখা ছিলো অসাধারণ সুন্দর। বিচিত্র ধরনের কাজ করতেন তিনি। সবই পরিপাটি নিখুঁত শিল্পিত রূপে। উনি নিজ হাতে আমাদের জামা কাপড় সেলাই, ইস্ত্রি করা, চুল কাটা, রান্না করা ছাড়াও ছোটোখাটো অসুখের চিকিৎসা যেমন টিকা দেয়া ইন্জেকশন দেয়া এসব ধরনের কাজ করতেন। আমার বাবাও ছিলেন একজন শিক্ষক। একজন আদশর্ শিক্ষকের মযার্দা ও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন তিনি।

বাবা গোছানো, ধীরস্থির আর পরিপাটি। দাদা চঞ্চল, অনুসন্ধিৎসু আর বোহেমিয়ান। আর আমি সম্ভবতঃ দুজনের মিশেল।
দুজনের কারোরই চারু-কারু শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলনা। অন্যদিকে আমার পড়াশোনা স্থাপত্য বিষয়ে। এখানকার পড়াশোনার ধরনটা অন্যরকম। আমার মতে এখানে সরাসরি কিছু শেখানো হয়না। শেখার প্রবণতা তৈরী করে দেয়া হয়। শিল্পস্বত্তাকে উস্কে নিংড়ে বের করা হয়। বুয়েট স্থাপত্যেছাত্রদের এই পদ্ধতির শিক্ষাদান আমার বেশ পছন্দ।

শৈশবে বাবার হাত ধরেই আমার লেখার হাতেখড়ি। রুল করা খাতায় উপরের লাইনে অসম্ভব রকমের সুন্দর হরফে একটা বাক্য লিখতেন। আমার কাজ ছিল উপরের লাইনের হুবহু অনুকরনে নিচের লাইনগুলো ভরাট করা।

বাবার লেখা সেই লাইনগুলো এরকম J

‘আম জাম কলা লিচু কমলা কাঁঠাল
ডালিম আতা ও লেবু লিচু কুল তাল’

এভাবে পদ্য ছন্দে ফল, ফুল, পাখি, গাছ, মাছ, পাহাড়, সাগর-মহাসাগর, মরুভূমি, দেশ, স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তি এরকম অসংখ্য বিষয় লেখা থাকতো। বারবার অনুকরণ করে লিখার ফলে হাতের লিখা সুন্দর ও একই সাথে ওসব বিষয় জানা এবং মুখস্ত হয়ে যেতো।

আরো থাকতো নীতিকথা, উদ্বৄতি, বিখ্যাত কবিতার চরন, ঐতিহাসিক ঘটনা, কালপঞ্জি এসব। যেমনঃ

দেশপ্রেমঈমানের অঙ্গ

সদা সত্য কথা বলিবে
মিথ্যা বলা মহা-পাপ
গুরুজনকে মান্য করিবে

সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি
সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি

চীনের রাজধানী পিকিং

কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেন
পিরামিড মিশরে অবস্থিত

আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের পর

তুমি নির্মল করে মঙ্গল করো
মলিন মর্ম ঘুচায়ে

বয়স তখন মাত্র পাঁচ কি ছয়। এসব আমার শিশুমনে দাগ কাটার সাথে সাথে তীব্র জানার আকাঙ্খা তৈরী করেছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমার সামান্য যেটুকু শিল্প-রুচিজ্ঞান সেটা স্বতঃস্ফুর্ত ও উত্তরাধিকার। আমি কখনোই আমার পিতা এবং পিতামহকে ছাড়িয়ে যেতে পারবোনা। কারণ তাঁরা ছিলেন নির্মোহ, আত্মনিমগ্ন ও ধ্যানী। আর আমরা অসুস্থ প্রতিযোগিতার একটা ক্রান্তিকালে নিক্ষিপ্ত হয়ে আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছি।

আমার আঁকা-আঁকি লেখা-লেখি সেই হাতে খড়ি থেকে। এখানে ঐসব প্রসঙ্গ এড়িয়ে শুধুমাত্র নিজের করা বাংলা ক্যালিগ্রাফি নিয়ে লিখছি।

সাধারনভাবে শৈল্পিক প্রবণতা সম্পন্ন যে কোন মানুষ শিল্প ও কলা সম্পর্কিতযে কোন বিষয়ে আগ্রহী হবেন। তবে একদিকে তাঁর ঝোঁক বা প্রবণতা থাকার সম্ভাবনা বেশী। অধিকতর চর্চাথেকে ঐ বিষয়ে তাঁর বুৎপত্তি তৈরী হয়।

গ্রাফিক্স এর প্রতি আমার দুর্বলতার কিছু কারণের মধ্যে আছে পূর্বোক্তপ্রেক্ষাপট এবং ছাত্রজীবনে প্রকাশনা ও ছাপাখানার কার্যসংযোগ। স্থাপত্যেপড়াশোনার সময় মিশ্র মাধ্যমে কাজের সুযোগ হয়েছে। কিন্তু পেশাগত ব্যস্ততায় সময় ও আয়াসসাধ্য কোন শিল্পসৃষ্টিকরা আজকাল আর হয়ে উঠেনা। এর যায়গা নিয়েছে ডুডল – সামান্য অবসরে আনমনে আঁকা-আঁকি। ইদানিং ডিজিটাল মাধ্যমে চমৎকার কিছু কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিক ও গাঢ় রংয়ের প্রতি আমি বরাবরই দুর্বল। উজ্জ্বল রং উৎসব উল্লাস ও  জীবনের প্রতীক।
আগেই বলেছি হাতে লিখা পুঁথি, জমিজমার দলিল এবং বাবা ও দাদার শিল্পিতা আমাকে দারুণ প্রভাবিত করেছিল। এমনকি আমার নিজের স্বাক্ষরটাও বাবার স্বাক্ষরের অনেনকটা নকল। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও সত্যজিৎ রায়ের হাতের লেখা স্ক্রিপ্টগুলো দেখে মনে হয়েছে সাহিত্য রচনার সাথে যুক্ত সবার হাতের লেখাই সুন্দর শিল্পিত।

এদেশে কেউ নিবেদিতভাবে বাংলা ক্যালিগ্রাফি চর্চা করেন কিনা জানা নেই। আগে বই-পুস্তক, সাময়িকী এর প্রচ্ছদ, পোষ্টার, ব্যানার এসবের ডিজাইনে ক্যালিগ্রাফিচর্চা দেখা যেতো। ইদানিং কম্পিউটারাইজড গ্রাফিক্সের ব্যাপক প্রসারে ঐ চর্চা একেবারেই কমে গেছে।
বাংলা ক্যালিগ্রাফি সম্পর্কিতআমার কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা জ্ঞান কোনটাই নাই। ডুডল আকারে যা করি তার পুরোটাই প্রায় স্বতস্ফুর্ত। এর মধ্যে আরবী ক্যালিগ্রাফি এবং মুসলিম ধাঁচের চিত্রকর্ম আমার কাছে অনেকটাই জ্যামিতিক মনে হয়েছে। রোমান বর্ণমালা খুব একটা ভাংচুর করার সুযোগ যেমন কম, সেটা আবার আরবী ও দেবনগরী বর্ণমালা গোষ্ঠীতে ততটাই বেশী।

নিজের লেখা বা ক্যালিগ্রাফি সম্পর্কে আমার কোন মূল্যায়ন নেই। এগুলো আদৌ শিল্প-মানোত্তীর্ন কিনা তা নিয়েও আমার সন্দেহ আছে। তবে মাহফুজ ভাইয়ের [ মাহফুজুর রহমানJস্থপতি, শিল্প-সমালোচক ও পেশাদার কূটনীতিক ] প্রকাশিত স্মৃতিচারণমূলক একটা লেখার অংশবিশেষ উল্লেখ করছি –

“আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি আহসান হাবীব ভাই আর সেলিমের বাংলা হাতের লেখা সৌন্দর্য ও নান্দনিক বিচারে শ্রেষ্ঠ। আহসান হাবীব ভাইয়ের লেখা কিছুটা জ্যামিতিক। সরল রেখা নির্ভর যেন গ্রীড আয়রন প্যাটার্নেঅনেকগুলো বিল্ডিং ব্লক পাশাপাশি সাজানো। সেলিমের হাতের লেখা আবার অনেক অরগানিক, জৈবিক। গোল গোল; প্রাকৃতিক, লতানো গাছপালার মতো, যেন নিসর্গবিস্তৃত কোণ।”

“অরগানিক, জৈবিক” উপমাটা আমার পছন্দ হয়েছে বলে উল্লেখ করলাম। জীবনবাদী সেরকম কিছু লুকানো চৈতন্যে আমার ভেতর কাজ করে মনে হয়।

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (১) »

Comments

comments