ইসলাম চমৎকার

ইসলাম চমৎকার
Print Friendly, PDF & Email

মসজিদে বাচ্চাদের কলকাকলী

নামাজের সময়ে মদিনার মসজিদে নববিতে (নবিজি (সাঃ) এর মসজিদ) প্রচুর বাচ্চার উপস্থিতি আমাকে বেশ চমৎকৃত করেছিল। এরা সবাই একসাথে দলবেঁধে এসেছিল। এদের সবার পরনেই ছিল তাদের প্রিয় সব খেলোয়াড় ডেভিড ভিয়া, মেসি, রোনালদো, ইনিয়েস্তা সহ আরও অনেকের জার্সি। কেউ কেউ আবার ঐতিহ্যবাহী সৌদি পোশাকও পরেছিল। মসজিদের ভিতর তারা দৌড়াদৌড়ি, খেলা, মারামারি, কান্না থেকে শুরু করে সব কিছুই করছিল কিন্তু সেই সাথে নামাজও আদায় করছিল!

এক রাতে তারাবির নামাজের কাতারে,আমার এবং পাশের লোকের মাঝখানে কিছুটা ফাঁকা জায়গা ছিল। একজন বাচ্চা এসে সেই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে পূরণ করল। নামাজের কাতারে কোন খালি জায়গা থাকা উচিত নয়- একজন শিশুর এমন জ্ঞান আমাকে মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু এরপরেই সে জায়নামাজের উপর চক্কর খেতে শুরু করলো! এবং কিছুক্ষণ পরেই সে কাছের একটা চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল, যেখানে বসে নামাজের পরে বয়ান করা হয়। খেলা শেষে সে ফিরে এলো এবং প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের মত পুরোদস্তুর নামাজ আদায় শুরু করলো। আলহামদুলিল্লাহ!

মসজিদের ভেতরেই দেখলাম কিছু বাচ্চা কাঁদছে এবং ভাইয়েরা একে অপরকে লাথি দিচ্ছে। এতে করে কাউকেই বিরক্ত মনে হয়নি। কেউ চিৎকার করে তাদেরকে থামতে বা চুপ করতে বলছিল না কিংবা পিছনের কাতারে পাঠাচ্ছিল না। একই বাচ্চাদের দেখলাম হাজীদেরকে ইফতারের জন্য সম্ভাষণ জানাচ্ছে, যার আয়োজক তার পরিবার। বাচ্চাগুলো ইফতারির জন্য দস্তরখান বিছিয়ে দিচ্ছিল এবং ইফতারের উচ্ছিষ্ট ও মসজিদ পরিস্কারে তাদের বাবাকে সাহায্য করছিল। সব মিলিয়ে বাচ্চারা মসজিদের ভেতরের সময়টা নিজেদের মত করে বেশ ভালোই উপভোগ করছিল।

কথিত আছে, একবার মসজিদে নামাজ আদায়ের সময়ে নবীজী হযরত মুহাম্মদ সাঃ যথারীতি সেজদায় গেলেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই তাঁর এক নাতি পিঠের উপরে চড়ে বসলো এবং অনেকক্ষণ যাবত সেখান থেকে আর নামছিল না। অবশেষে অনেকক্ষণ পরে যখন সে নামলো তখন হুজুর সাঃ সেজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ আদায় শেষ করলেন। তাঁর পিছনে নামাজ আদায় করা মানুষজন এতে রীতিমত ধাঁধাঁর মধ্যে পড়ে গেল। তারা নবীজীকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল সাঃ, আপনি কি সেজদার মধ্যে আল্লাহর কাছ থেকে কোন ওহী পেয়েছিলেন যার দরুন এতক্ষণ দেরী করলেন?” প্রিয় রাসুল সাঃ প্রত্যুতর করলেন, “না। আমি যখন সেজদায় ছিলাম, তখন আমার এই নাতি এসে আমার পিঠে চড়ে বসেছিল। এবং আমি তাড়াতাড়ি উঠে তার খেলাটা নষ্ট করতে চাইনি।”[1] আমরা কি আমাদের শিশুদের জন্য মসজিদটাকে এমন আনন্দঘন জায়গায় পরিণত করতে পারি? আর এর বিকল্পটা হচ্ছে, তারা যখন বড় হয়ে উঠবে তখন এদের সবাইকেই মসজিদ থেকে হারিয়ে ফেলা!

ক্ষুদ্র সম্বলের বসবাস

আমরা মসজিদে নববিতে ঢুকলাম, যা কিনা আমাদের (আমি এবং আমার ভায়রা) আগামী কিছু দিনের আবাসস্থল হতে চলেছে। আমাদের প্রত্যেকের সাথেই ২টি পাঞ্জাবী, ১টা পাজামা, ২টি গেঞ্জি, চাদর হিসাবে ব্যবহার্য ১ টুকরো ইহরামের কাপড়, ১টি সাবান ও মেসওয়াক, দুজনের ব্যবহারের জন্য ইন্টারনেট সুবিধাবিহীন একটা মোবাইল ফোন এবং আমার প্রিয় লুঙ্গি। এখানে আমার বারিধারার বন্ধুদের একটা ব্যাপার জানিয়ে রাখা ভাল যে পবিত্র কাবা শরীফ এবং মসজিদে নববির মত উচ্চ মর্যাদার জায়গাতে লুঙ্গি কোন নিষিদ্ধ বস্তু নয়। আমি বেশ কিছু লোককে দেখেছি যারা লুঙ্গি পরে তাওয়াফ করছেন। এই সবকিছু ছিল একটা কাপড়ের ব্যাগে যারা ওজন মোটামুটি এক কিলোগ্রাম। মসজিদের ভিতরে আমাদের ঠিকানা ছিল ৯৩৩ নং পিলার। পিলারের লাগোয়া জুতা রাখার তাকের উপরে লেখা এই নাম্বারই আমার ঠিকানা। পূর্ব বা বর্তমানের কোন পরিচয় এখানে অবান্তর। আমরা মসজিদের কার্পেটে ঘুমাতাম, অপরিচিতদের দেওয়া খাবার খেতাম, টয়লেট কিংবা গোসলের জন্য লাইন ধরতাম। আমাদের চার বাথরুম এপার্টমেন্টএ র জগতের সঙ্গে এর বিস্তর ফারাক। পরবর্তী দিনের ব্যবহারের জন্য প্রতিদিনই আমরা হাতে কাপড় ধুতাম এবং মসজিদ প্রাঙ্গনে শুকাতে দিতাম। সে সময় মনে হল, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম শেষ কবে হাতে কাপড় ধুয়েছি কিংবা সেগুলো রোদে শুকাতে দিয়েছি!

আমরা বেশ কঠিন কার্যসূচীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভোররাত ৩টায় উঠতাম সেহরি এবং ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য। ভোর ৫টা থেকে ৯.৩০ পর্যন্ত ঘুমাতাম, ইবাদত এবং প্রতিদিনের বাকি সব কাজ রাতের এ’শা এবং তারাবীনামাজের পর ১২টার মধ্যেই সেরে ফেলতাম। এখানে যে কথাটা না বললেই নয় যে এমন বিলাসবর্জিত অবস্থার মধ্যেও আমি বিন্দুমাত্র অস্বস্তি অনুভব করিনি এবং আমি আক্ষরিক অর্থেই অবাক হয়েছিলাম যে আমাদের প্রয়োজন আসলে কতখানি এবং আমরা কতটা অপচয়মূলক জীবনযাপন করি।

তবে অর্থনীতির উপর পূর্বজ্ঞান আমার মনে তিনটা ভিন্ন প্রশ্নের উদয় করলোঃ যদি আমরা সকলেই এমন স্বল্প সম্বল নিয়ে জীবনধারণ করি তবে প্রবৃদ্ধি এবং নিয়োগ/ কর্মসংস্থান আসবে কোথা থেকে? সত্যিই কি আমাদের চলমান ভোগবাদী আর অপচয়ী জীবনধারা টেকসই থাকবে? আমরা কি আমাদের সম্পদ সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অংশের সাথে ভাগাভাগি করতে পারিনা?

‘সামাজিক ব্যবসা’ বেশ সুপরিচিত একটা ধারণা। ‘সামাজিক আয়’ কিংবা ‘সামাজিক সম্পদ’ ধারণাটা কেমন? আমরা যেসব অর্থ এবং সম্পদ আয় করবো সেটা কেবল আমার এবং আমার পরিবারের একার নয়, বরং সমাজের বৃহত্তর অংশের তাতে অধিকার থাকবে। অবশ্য আমি বাধ্যতামূলক কর আরোপের কথা বলছিনা, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অংশের সাথে স্বেচ্ছায় আয় এবং সম্পদ ভাগাভাগির কথা বলছি।

অন্যকে খাওয়ানো ও অপরিচিতকে সহায়তা

ইফতারের সময়ে মসজিদে নববি এবং এর প্লাজা বিশাল এক রেস্টুরেন্টে রুপান্তরিত হয় যেখানে রমজানে লাখো মানুষের জন্য খাবার বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। আসরের নামাজের পরপরই, নামাজের কাতার গুলোতে প্লাস্টিকের শিট বিছানো হয় এবং সেখানেই খাবার দেওয়া হয়। মসজিদের সবার জন্য একই ইফতারিঃ তাজা খেজুর, দই এবং দুজ্ঞা (দইয়ে মিশাবার মশলা), পাউরুটি, যমযমের পানি, কাহওয়াহ (আরবের ঐতিহ্যবাহী পানীয়) এবং পুদিনার সুগন্ধি চা। মসজিদের বাইরে বাড়তি আইটেম যেমন ফলের জুস, আপেল, কলা, মিষ্টি, জলপাই এমনকি মুরগির বিরিয়ানিও বিতরণ করা হয়। এটা পুরোটাই ব্যক্তিগত উদ্যোগ। পরিবারগুলো খাবার আনে এবং তাদের জন্য নির্ধারিত দুই পিলারের মধ্যবর্তী জায়গার মধ্যে খাবার রাখে। আমি জানতে পেরেছিলাম যে, কোন কোন পরিবার গত ১০০ বছরেরও বেশি সময় যাবত মসজিদের ভেতরে খাবার বিতরণ করে যাচ্ছে এবং এই সুযোগ পাওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় আরও অনেকেই আছে! বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এক সৌদি নাগরিক গত ৪০ বছর যাবত ১২১ নং পিলারে ইফতার বিতরণ করছেন! কেউ মসজিদে প্রবেশ করা মাত্রই ছোট শিশুরা সেই হাজীকে তাদের সাথে ইফতারির আমন্ত্রণ জানায় এবং কেউ যদি সেই দাওয়াত না নেয় তবে হতাশ ও মনঃক্ষুণ্ণ হয়।

মাগরিবের আজান পড়া মাত্রই হাজীরা ইফতারির দস্তরখানের দুই পাশে বসে পড়েন এবং রোজা ভাঙ্গেন। ইফতারি শেষ হওয়ার দুই মিনিটের মধ্যেই প্লাস্টিকের শিটগুলো তুলে ফেলা দেওয়া হয় এবং জায়গাটি আবার নামাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। আমাদের শেষ ইফতারিতে আমরা আমাদের আপাত বাসস্থল পিলার ৯৩৩ এ ইফতারএর আয়োজন করা আরব ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানাতে গেলাম। এতে করে তিনি বেশ লজ্জিত ও বিব্রত হয়েছেন বলে মনে হল এবং নিজ আরবি ভাষায় কিছু বললেন যার কিছুই আমি বুঝিনি। কিন্তু তার অঙ্গভঙ্গি দেখে বুঝলাম আমাদেরকে ইফতারি করাতে পেরে তিনি নিজে বেশ কৃতার্থ হয়েছেন এবং এজন্য আমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি এটাও দেখলাম যে নামাজের পরে অনেকে মসজিদের ভেতর ৫০, ১০, ৫ রিয়াল করে গরীবদের মাঝে বিলাচ্ছেন। আমরা কি সেই দিন দেখতে পাবো যেদিন গরীবরা ধনীদের কাছে যাওয়ার বদলে ধনীরাই গরীবদের কাছে যাচ্ছেন? যখন আমাদের দানগুলো ক্যামেরা, প্রচার-প্রচারণা কিংবা রাজনীতিবিদদের ফটোসেশনের জন্য হবেনা? কবে আমরা সেই অবস্থায় পৌঁছাতে পারবো যেদিন ডান হাতে দান করার সময় বাম হাতও জানতে পারবেনা?

গুনাহের প্রায়শ্চিত্ত

মসজিদে নববিতে অবস্থানের মূল উদ্দেশ্যই ছিল নিজের করা গুনাহের জন্য মাফ চাওয়া। মনে মনে একটা তালিকা করবার চেষ্টা করলাম যে কি কি গুনাহ করেছি যার মধ্যে আছে নামাজ-রোজা-যাকাত বাদ যাওয়া,সুদ হারাম সত্ত্বেও তা গ্রহণ করা, বাবা-মা’র অবাধ্য হওয়া, স্ত্রী-সন্তান-পরিবার-বন্ধু-কলিগ-প্রতিবেশীদের প্রতি অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়া ইত্যাদি, ইত্যাদি। যতগুলো সম্ভব গুনাহের ঘটনা মনে করতে থাকলাম। মনে হচ্ছিল এই গুনাহের তালিকা এতই লম্বা যে ফুরোবে না। সবকিছু মনের সেলুলয়েডে সব ভেসে আসছিল আর হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছিলাম। ভাবছিলাম, আমি যদি জীবনকে আবার প্রথম থেকে শুরু করতে পারতাম? তখন আলোর ঝিলিকের মত আল কোরআনের একটা আয়াত মনে পড়লো!

বলুন, হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ তোমরা আল্লাহ রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ্ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমূখী হও এবং তাঁর আজ্ঞাবহ হও তোমাদের কাছে আযাব আসার পূর্বে। এরপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না; (সূরা যুমার ৩৯:৫৩:৫৪)

আমি অনুতপ্ত বোধ করছিলাম এবং নিঃশঙ্কচিত্তে ক্ষমা চাইতে লাগলাম। সেই সাথে একটা স্পষ্ট উপসংহারে পৌঁছালাম। একজন নিকৃষ্ট গুনাহগার বান্দা হিসেবে আমি আর কখনোই কারো বিশ্বাস কিংবা আমল সম্পর্কেপ্রশ্ন তুলবো না।

চুম্বক আর ট্যাবলেট

রাত প্রায় ৩টায় সেহেরি খেয়ে আমরা কাবা’র উদ্দেশ্যে রওনা দেই যা কিনা আমাদের আবাসস্থল থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে। যতই সামনে এগুতে লাগলাম জনসমুদ্র বিশাল থেকে বিশালতর হতে লাগলো। গাড়ি এবং পথচারীদের আধিক্যে রাস্তাগুলো এক প্রকার বন্ধই হয়ে গেল। কাবার কাছাকাছি পৌঁছাতেই মনে হচ্ছিল সারা পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে মানুষ এসে যেন এখানে জমায়েত হয়েছে। এ এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য! যেন বিরাট এক চুম্বকের টানে সবাই এগিয়ে চলছে।

নামাজ শেষে এই বিশাল জামাতের দিকে তাকালাম। ২০০২ সালে আমার প্রথম কাবা দর্শনের সাথে তুলনা করে মনে হল এই জমায়েত যেন আরও বেশি তরুণ এবং অধিকতর স্মার্ট। সেবার দেখেছিলাম লোকেরা শেলফ থেকে কোরআন নিয়ে পড়ছে। আর এইবার দেখলাম অনেকেই কোরআন পড়ছেন নিজেদের ব্যক্তিগত আইপ্যাড, স্যামসাং গ্যালাক্সি ট্যাব সহ আরও অনেক ট্যাবলেট, এবং এমনকি এমাজনের কিন্ডলে রিডারও দেখলাম বেশ কিছু। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমাদের প্রজন্মে আমরা নিজেদের উদ্বুদ্ধ করার সীমিত ক্ষমতা, জ্ঞানের স্বল্পতা ও আধুনিক প্রাযুক্তিক জ্ঞানের অভাবের কারণে ইসলামের বার্তা চারদিকে আশানুরুপভাবে ছড়াতে পারিনি। কিন্তু আমি আশাবাদি যে এই তরুণ-স্মার্ট এবং ইসলাম সচেতন প্রজন্ম নিজেদের ইসলামের পতাকাকে আরও উঁচুতে তুলে ধরবে এবং অতীতের গৌরবময় সুদিন ফিরিয়ে আনবে।

আরব্য রজনী

৮ই জুলাই স্থানীয় সময় রাত ১০:৪৫ এর দিকে আমরা জেদ্দা এয়ারপোর্টে পৌঁছালাম এবং বিস্ময়করভাবে খুব দ্রুত ক্লিয়ারেন্স পেলাম। সেই সন্ধ্যায় রমজানের চাঁদ দেখা যাওয়ার একটা সম্ভাবনা ছিল। সেরাতে ঈদের চাঁদ দেখা যায় নি। আমাদের বলা হলো রমজান দুইদিন পরে ১০ জুলাই শুরু হবে। এয়ারপোর্টএ একটা লোকাল সিম কেনার পরে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। জেদ্দার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় সেই মধ্যরাতেও ঝলমলে শপিং মল আর রাস্তা ভর্তি গাড়ি চোখে পড়লো। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে গ্যাসোলিনের দাম জিজ্ঞেস করলাম। সে জানাল ১ রিয়াল (বাংলাদেশি ২১ টাকা)। পরে আবিষ্কার করলাম যে আধা লিটারের পানির বোতলের দামও ১ রিয়াল! গ্যাসোলিনের দাম, পানির দামেরএক-চতুর্থাংশ। পানি আর গ্যাসোলিনের দামের এমন তারতম্যের কারণেই হয়ত মাঝরাতে রাস্তাভর্তি গাড়ি আর ঝলমলে শপিং মল!

আমাদের তরুণ বন্ধু সাঞ্জারিকে ধন্যবাদ। আমাদের ছোট ব্যাগেজগুলো তার আত্মীয়ের হোটেল কক্ষে রেখে কাবা তাওয়াফ, সাফা-মারওয়া সাঈ করা, মাথা মুন্ডন করা সহ উমরাহের বাদবাকি কাজ সম্পন্ন করতে গেলাম। গভীর রাতে উজ্জ্বল আলোর নিচে অজস্র হাজীকে দেখে পরাবাস্তবের দুনিয়া মনে হচ্ছিল। আল্লাহকে ধন্যবাদ আমাকে সুযোগ দেওয়ার জন্য। আবার ব্যাগগুলো সংগ্রহ করে বাসস্থানের দিকে রওনা দিলাম। আমরা প্রচণ্ড ক্লান্ত ছিলাম। যার কারণে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরের বাসাকেও অনেক দূর মনে হচ্ছিল। আমার ক্লান্তসঙ্গী, সেনাবাহিনীর এক অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল বলতে লাগলেন আমরা বোধহয় বাসা পিছনে ফেলে এসেছি। আমি কৌতুকের সুরে বললাম বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমীতে তোমার ট্রেনিং বোধহয় ঠিকঠাক ভাবে হয়নি! পরে অবশ্য এই মন্তব্যের জন্য আত্মশ্লাঘা অনুভব করেছি। অল্প কিছুক্ষণ হাঁটার পরেই আমরা বাসায় পৌঁছে গেলাম। গোসল করলাম এবং ইহরাম ছাড়লাম। একই সাথে প্রচন্ড ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত ছিলাম বিধায় রাত ৩টা বাজেই খাবারের সন্ধানে বের হলাম। দুটি পিটা ব্রেডের সাথে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, বেগুন, পেঁয়াজ দিয়ে খাবার চালিয়ে দিলাম। পেটে ক্ষুধা ছিল বিধায় এই অদ্ভুত খাবারকেও অমৃত মনে হচ্ছিল।

দ্বিতীয় উমরাহ

আল্লাহের নবী (সা:) বলেছেন “যখন রমজান মাস আসে তখন উমরাহ করতে যাও, কারণ রমজান মাসে উমরাহ হচ্ছে আমার সাথে হজ্জ্ব করার শামিল।” এটি আল্লাহের নবীর (সা:) সুন্নাহ, কিন্তু ফরয হজ্জ্বের বিকল্প নয়।

আমাদের পূর্বের উমরাহ রমজানের আগেই করেছিলাম। তাই অতিরিক্তসওয়াবের কথা ভেবে রমজানের প্রথম দিনেই আরেকটা উমরাহ করার কথা ভাবি। ফজরের নামাজের পরপরই, আমরা মক্কার অধিবাসীদের জন্য নির্ধারিত মিকাত “তানিম” এর (মসজিদে উমরাহ) উদ্দেশ্যে রওনা দেই। যা কিনা পাঁচ কিলোমিটার দূরে। আমরা ইহরাম বাঁধলাম এবং উমরাহ শুরু করলাম। সাফা-মারওয়ার সাঈ শুরু করার আগ পর্যন্ত সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। আমার হাঁটুতে প্রচন্ড ব্যাথা পেলাম। যার ফলে হাঁটা প্রায় অসম্ভব হয়ে গেল। তখনই মনে পড়ে গেল, খুব বেশি আগে নয়, আমি আমার ভায়রার শারীরিক ফিটনেস আর হাঁটাহাঁটির ক্লান্তির ব্যাপারে রসিকতা করেছিলাম। এখন সে অনায়াসে সাঈ করছে আর আমি অক্ষম! আমি সাঈ করা বন্ধ করে দিলাম এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম যেন তিনি আমাকে উমরাহ সম্পন্ন করার তওফিক দেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি হাঁটুতে শক্তি ফিরে ফেলাম এবং সাঈ ও উমরাহ শেষ করে হেঁটেই বাসাতে ফিরে আসলাম!আবারো উপলব্ধি করলাম যে আমাদের সবকিছুই আল্লাহর কাছ থেকে উপহার পাওয়া। এইসব কিছু আল্লাহই দিয়েছেন এবং তিনি চাইলে কোন নোটিশ ছাড়াই তা কেড়ে নিতে পারেন।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন: আবদুল্লাহ আল ইমরান

[1] http://www.7cgen.com/index.php?showtopic=4842

Comments

comments