অদ্ভুত ছবিগুলো (১০)

0
303
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

অদ্ভুত ছবিগুলো (৯) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

এই ফাইলের বেশিরভাগ আইটেমের দাম উনি জানেন, শুধু একটা বাদে। কয়েকটা ফোনকল করে তিনি তার বিদেশী সাপ্লায়ারদের কাছ থেকে এটা জেনে নিতে পারবেন।  

 

অন্য ফাইলের সবগুলো আইটেমের দামও উনার জানা আছে। একটা আইটেমের নামের উপর চোখ পড়তেই কেমন যেন চেনা মনে হলো কিন্তু দামটা মনে পড়ছে না। অনেক ভেবেও কিছুই মনে করতে পারছেন না যে কোথায় এই নামটা পড়েছেন। শুধু এইটুকু মনে আছে, এই মেশিন বেশ কয়েক বছর আগে একবার সাপ্লাই দেওয়া হয়েছে। ক্লায়েন্টের নামটা মনে নেই।  

মেশিনটা নিয়ে ভাবতেই ওসমান সাহেবের মনে পড়ে গেল, SPECT  (Single Photon Emission Computed Tomography) মেশিনগুলো Nuclear Medicine Tomography imaging টেকনিকের মাধ্যমে গামা রে ব্যবহার করে। সাধারণCT Scanning পদ্ধতির সাথে বেশ অনেক পার্থক্য এটার।

 

প্রথম যখন দুলাভাই এই মেশিনটা আনান তখন একরকম হৈ চৈ পড়ে যায় দেশে কারণ এটা ছিলো তখনকার দিনে অত্যন্ত আধুনিক এবং আনকোরা। অ্যালঝাইমার আর ডিমেনশিয়ার ডায়াগনসিস এর জন্য সবচেয়ে কার্যকর একটা আবিস্কার। 

ইন্টারকমে মাহেরাকে আসতে বললেন ওসমান সাহেব। কয়েকটা ফোন করলেন তারপর চিন্তিত মনে আবার জানালার দিকে তাকালেন। এখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টিভেজা আকাশ বাইরে!

 

কিছুক্ষনের ভেতর হাতে নোটপ্যাড আর কলম নিয়ে এসে হাজির হলো মাহেরা। স্বভাবজাত ভাবেই দরজা পর্যন্ত এসে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে। ওসমান সাহেব ওকে ইশারা করলেন ভেতরে আসার।

 

ফাইলটা ওর দিকে এগিয়ে দিলেন। তোমার কি SPECT/CT কামেরার ব্যাপারে কোনও ধারণা আছে?

 

এর ব্যবহার সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা আছে স্যার।

 

সেই মোটামুটিটা কতটুকু? তুমি কি জানো জিনিসটা কিভাবে কাজ করে? 

 

না স্যার। টেকনিকাল ব্যাপারটা জানি না তবে এটুকু জানি এটা কি, কোথায় আর কেন কাজে লাগতে পারে এইসব। রয়াল কলেজ অফ নার্সিংথেকে একটা জার্নাল আসে আমাদের অফিসে। ওখানেই পড়েছিলাম কিছুটা। নিউজে পড়েছিলাম যে গতবছর এমন কোনও একটা মেশিন বেলজিয়ামের একটা কোর্টে ব্যবহার করা হয়।  

 

কোর্টে? ওখানে এটা কেন ব্যবহার করা হবে? তুমি ঠিক জানো? 

 

জ্বী স্যার! আপনি কি বেলজিয়ামের ওই ঘটনাটা জানেন? ওই যে, খুব অল্প বয়স্ক অ্যান্টিসোসাল একটা ছেলে ওখানকার একটা বাচ্চাদের নার্সারিতে ঢুকে পড়ে। ওখানকার বেশ কয়েকজন বাচ্চা, নার্স আর কেয়ারটাকারকে চাকু দিয়ে কি নির্মমভাবে যে আহত করেছে। দুজন বাচ্চা আর একজন ন্যানি মারা যায় ওই ঘটনায়। 

 

এটা তো শুনিনি ! বেলজিয়াম তো অত্যন্ত সুশীল একটা দেশ বলেই জানতাম, ওখানে এমন নৃশংস ঘটনা?  

 

জ্বী। এটা তো বেশ অনেক আগের ঘটনা কিন্তু এতদিন সেই কেস চলছিল। গতবছর কোর্টে যখন ওই ছেলেকে হাজির করা হয় তখন তার উকিল জানায় ছেলেটা নাকিSchizoid Psychosis এ ভুগছিল। তাই কোর্টেই তখন SPECT ক্যামেরা বসানোর অর্ডার হয় যেন আসামীর মস্তিস্কের সঠিক খবর জানা যায়। 

 

মজার ব্যাপার তো। কোর্ট এটা অনুমতি দিলো? এ ধরনের কিছু তো কোর্টে ব্যবহারের কথা না। তারা পুলিসের আন্ডারে সোজা মেডিকেল চেক আপে পাঠিয়ে দেবে। 

 

আপনি হয়ত খেয়াল করেননি স্যার। আমাদের দেশের কয়েকটা পত্রিকায় ওই হত্যাকান্ড নিয়ে লেখা হয় কিন্তু ছোট আকারে। এজন্যই হয়ত আপনার চোখে পড়েনি। 

 

তাহলে তো দেখা যাচ্ছে তুমি এটা সম্পর্কে কার্যকরি মানে আমাদের যতটুকু জানা দরকার ততটুকু তথ্য জানো। ভালই হলো মাহেরা। ওসমান সাহেব মাহেরাকে বুঝিয়ে বললেন গামা রে ব্যবহার করে কিভাবে এই ইমেজিং টেকটিক কাজ করে। 

 

এটার একটা কোটেশান আমাদেরকে তৈরি করতে হবে। বারিধারায় নতুন যে হাসপাতালটা হবে ওদের একটা ইউনিটের জন্য। অনেক বছর আগে একজন এই মেশিন আনিয়েছিলেন। দেশের রাজনৈতিক অবস্থা আর ক্ষমতার টানাটানিতে পড়ে প্রজেক্টটা পরে বন্ধ হয়ে যায়। মেশিনপত্র ওভাবেই হয়ত পড়ে আছে। ধুলোময়লা অবস্থায় সম্ভবত বিক্রিও হয়ে গেছে ওজন হিসাবে। আমাদের দেশে এটা হরহামেশা হচ্ছে, বিশেষ সরকারী প্রোজেক্ট এর ক্ষেত্রে।

 

ঠিকই বলেছেন স্যার। আমরা কি এখনও এই মেশিন সাপ্লাই দেই? 

 

সবচেয়ে জরুরী প্রশ্নটা করেছো তুমি। যতদূর মনে আছে, দুলাভাই একটা কোম্পানীর সাথে কাজ করেছিল এটা নিয়ে। ওদের নামটা মনে পড়ছেনা। বেইসমেন্টে যেয়ে খুঁজে দেখা যেতে পারে। হয়ত পুরনো কোনও ফাইলে পাওয়া যাবে। 

একরকম আধভেজা হয়ে ত্রিরঞ্জন পৌঁছুল হাসানের শোরুমের সামনে। দোতালায় উঠে প্রথমেই পড়ে ওর শোরুমটা। বেশ সুন্দরভাবে সব ছবিগুলো সাজানো দেয়ালে। মাঝে মাঝে সুদৃশ্য দুই একটা পুরনো ফার্নিচার রাখা। 

 

সোজা হাসানের রুমের সামনে চলে গেল ত্রিরঞ্জন। কাষ্টমার বলতে কেউ নেই। ওর অ্যাসিষ্ট্যান্ট ছেলেটা এক কোনায় একটা ডেস্কের সামনে বসে আছে। 

 

বাইরে পায়ের শব্দে হাসান তাকালো, আরে ! ত্রিরঞ্জন যে। বন্ধুর সাথে হাত মিলিয়ে হাসান ওকে নিয়ে এলো ভিতরে। কি সৌভাগ্য আমার, এতদিনে তোর দেখা পাওয়া গেল। 

 

আমিও অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম যে মুকুল আর তোর সাথে একটু আড্ডা দেবো। কিন্তু সময় করে উঠতে পারছি না। 

 

কেন, কিছু নিয়ে তুই ব্যস্ত নাকি? ইউনিভার্সিটির পাঠ তো শেষ রে। চাকরি বাকরি খুঁজছিস নাকি মামার ওখানেই বসে পড়বি?

 

না-রে! মামা গো ধরেছেন মাষ্টার্স এর জন্য। কিন্তু বুঝতে পারছি না কি করবো বা করা উচিৎ।

 

মাষ্টার্সটা অবশ্য তোর করা উচিৎ। তোদের মতো  ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টরা যদি পড়াশুনার পাঠ এতো তাড়াতাড়ি সেরে ফেলে তাহলে দেশের কি অবস্থা হবে রে? 

 

দূর! তুই আছিস দেশ নিয়ে। পড়তে আর ভাললাগে না। ভাবছিলাম এইবার একটু শান্তি পাব। মামার জন্য তা আর হবে না মনে হচ্ছে। 

 

কেন? অসুবিধাটা কোথায় তোর? দেখবি দিব্যি দেখতে দেখতে চলে গেছে বছরটা। 

 

এক বছরের ব্যাপার হলে তো হতোই । মামার ইচ্ছা দেশের বাইরে যেয়ে যেন পড়শুনা করি। কয়েকটা ইউনিভার্সিটিতে এরই মধ্যে  ওদের কোর্শ ক্যাটালগ চেয়ে পাঠিয়েছেন। কিছুদিন আগেই আমাকে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির ক্যাটালগ ধরিয়ে দিলেন।  

 

তাহলে তো তোর কাজ অর্ধেক হয়েই গেছে। তুই শুধু দেখেশুনে বের করো কোন প্রোগ্রাম তোর জন্য ভালো হবে। 

 

তাই করছি। এইসব নিয়েই একটু ব্যস্ততা চলছে ইদানিং। যাকগে, এসব বাদ-দে। তোর খবর কি? আমাকে হঠাৎ হন্যে হয়ে খুঁজছিস? 

 

তুই কি মামার কাছ থেকে মেসেজ পেয়েছিস নাকি তোর সাথে ঢেউ বা মুকুলের এর দেখা হয়েছিল? 

 

তুই তো দেখছি কাউকেই বাদ রাখিস নি। মামাকে কখন জানালি? 

 

সকালে তোর বাসায় ফোন করলাম কিন্তু কোনও সাড়া শব্দ পেলাম না। পরে মামাকে ফোন করেছিলাম। কিন্তু মামা তখনো অফিসে এসে পৌঁছাননি। মাহেরা আপুর কাছে মেসেজ রেখেছিলাম। 

 

না, মামার সাথে আমার কথা হয়নি। এখন আমি মুকুলদের বাসা থেকেই এলাম। ঢেউ এর কাছে শুনলাম তুই নাকি আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিস! গতকাল শুনলাম মুকুলের কাছে। কেন রে?

………………..চলবে

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (১১) »

Comments

comments