অদ্ভুত ছবিগুলো (২)

0
343
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

 অদ্ভুত ছবিগুলো (১) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

 

… মুকুলদের ওখান থেকে বেরিয়ে ত্রিরঞ্জনের ইচ্ছা হল হাসানকে খুঁজে বের করতে। কিন্তু ঠিক জানে না ওকে কোথায় পাওয়া যাবে এখন। একবার ওর অফিসে হানা দিলে হয়। এসময় অফিসেই থাকার কথা হাসানের। 

 

কিন্তু মত পাল্টাল ত্রিরঞ্জন। যদিও খুব জানতে ইচ্ছা হচ্ছে যে ছবির ওই লাল কোটপরা মেয়েটার ব্যাপারে বৃদ্ব ভদ্রলোকের আগ্রহের কারনটা কি! মেয়েটার ব্যাপারটা ভীষণ অদ্ভুত লাগে ওর কাছে। এ মুহুর্তে ছবিটার ব্যাপারে হাসানের সাথে আলাপ করতে ঠিক স্বস্তি বোধ করবে না ও। কারন ওর নিজেরও জানা নেই মেয়েটাকে ও কিভাবে চেনে। 

 

বাসায় ফিরে যাবার সিদ্বান্ত নেয় ত্রিরঞ্জন। মাঠটা পেরিয়ে রাস্তায় চলে আসে ও। ওখানে অনেক্ষন অপেক্ষা করেও কোনও রিক্সা পায় না। এমনিতেই এ-সময়টায় রিক্সা খুব কম পাওয়া যায় এদিকটায়। হাটতে হাটতে বড় রাস্তার দিকে চলে আসে ত্রিরঞ্জন। এই দুপুরে ঘুরতে একদম ভাললাগে না ওর। হঠাৎ করেই একটা রিক্সা পেয়ে যায় ও। 

 

রিক্সায় বসে ভাবতে থাকে মেয়েটার কথা, ছবিটার কথা, সেদিনের কথা। ওটা আঁকবার পর বহুবার সে ভেবেছে ওইদিনের অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা। এমন অভিজ্ঞতা ওর আরও বেশ কয়েকবার হয়েছে কিন্তু কখনই এসবের কোনও কুলকিনারা করতে পারেনি ত্রিরঞ্জন । ব্যাপারটা কাউকে বলবে ভেবেও বলেনি কারন ও নিজেই যার ব্যাখা জানে না সেটা অন্যরা কিভাবে ব্যাখা করবে শুধু ওর মুখ থেকে শুনে? মাঝে মাঝে খুব অসহায় বোধ করে ও। 

 

ইদানিং কেন যেন ওর মনে হয় ঢেউ আর মুকুল-কে ব্যাপারটা বলা যায়। মুকুল অবশ্য শুধু শুধু হইচই করবে, কোনও সমাধান বা ব্যাখ্যা দিতে পারবে না, তবে ঢেউ-কে নিশ্চিন্তে বলা যায়। তাছাড়া কেন যেন এই ব্যাপারে ঢেউ ছাড়া আর কারও সাথে ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করতে ইচ্ছা হয় না। ওর বন্ধু ও পরিচিতদের সংখ্যা অনেক কম, আর তার মধ্যে মুকুল, হাসান, ঢেউ এর অবস্থান অনেক কাছের। কিছু মানুষ থাকে যাদের উপর নির্ভর করা যায় খুব সহজে। যদিও হাসানকে কখনও দেখেনি নিজের ব্যাপার ছাড়া অন্য কারো ব্যাপারে মাথা ঘামাতে, তবু জানে ওকে বিশ্বাস করা যায়। মুকুলের প্রথম সমস্যা ওর লজিক অনেক পরে কাজ করে, যে কোনও সমস্যার সমাধান এক মুহুর্তে করে দিতে চায়। মুকুলের সততা ওকে মুগ্ধ করে সবসময়, এই জন্যই মুকুলের সাথে সময়টা ওর খুব ভাল যায়। ঢেউ একদমই অন্যরকম, কোনও কিছুর অনেক গভীরে খুব সহজে প্রবেশের একটা সহজাত ক্ষমতা আছে ওর। খুব ভালভাবে ভেবেচিন্তে কথা বলে ঢেউ। মেয়েরা নাকি বয়সের চেয়ে একটু বেশী গভীরভাবে ভাবতে পারে, কথাটা অন্যদের ক্ষেত্রে কতটা সঠিক তা ত্রিরঞ্জনের জানা নেই তবে অনুভব করে ঢেউ এর ব্যাপারে মনে হয় কথাটা সঠিক। 

 

কোনও ব্যাপারে ত্রিরঞ্জন যখন কিছুই কুলকিনারা করতে পারেনা তখন খুব অসহায় বোধ করে ও । অনেক সময় ঢেউ এর সাথে ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করলে কিভাবে যেন খুব সহজে সেটা ওকে বুঝিয়ে দেয় মেয়েটা। এইজন্যই ইদানিং খুব মনে হয় ছবির ব্যাপারটা ওর সাথে আলাপ করা যায়, দেখা যাক মেয়েটা কিভাবে ব্যাখা করে। কিন্তু বলবে বলবে ভেবেও কেন যেন বলা হয়ে উঠেনা।  তবু এটুকু ভাবনা ওকে সস্তি দেয় যে ঢেউকে বললে হয়ত কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে ওর কাছ থেকে। 

 

ত্রিরঞ্জন বুঝতে পারে না ওর ভেতরে কি ঢেউ এর জন্য বিশেষ কোনও অনুভুতি আছে? ওদের বাসা থেকে চলে আসবার সময় খুব ইচ্ছা হচ্ছিল ঢেউকে বাই বলে আসে, কিন্তু ওকে খুঁজে পায়নি। আচ্ছা, ওর আচরনের ভেতর কোথাও কি এমন কিছু আছে যেটা থেকে কেউ বুঝতে পারবে ওর মনের মধ্যে কি হচ্ছে? নিজেই কেমন যেন একটু অস্বস্তি বোধ করল ত্রিরঞ্জন। কিন্তু তবুও মন বলছে ওর হয়ত ঢেউ এর সাথেই এই ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করা উচিৎ। 

 

মাথাটা আবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ওর। ওই অদ্ভুত ছবিগুলোর কথা মনে হচ্ছে বারবার, বিশেষ করে লালকোট পরা ওই মেয়েটার ছবি। মুকুলের কাছে ছবিটার কথা শুনে, হাসান খুব অনুরোধ করেছিল ওটা দিতে। ত্রিরঞ্জনের বেশিরভাগ ছবিই হাসানের শো-রুমে আছে। কিন্তু কেন যেন ইচ্ছা হয়নি বিশেষ কিছু ছবি দিতে। তার মধ্যে ওই লালকোট পরা মেয়েটার ছবিটা একটা। হাসানকে ছবিটা দিতে কেন ইচ্ছা হয়নি তা ও নিজেও জানে না। 

 

তবুও হাসানের পিড়াপিড়িতে শেষ পর্যন্ত মুকুলের কাছে ছবিটা পাঠিয়ে দিয়েছিল ত্রিরঞ্জন। ঢেউ জানতে চেয়েছিল ছবির মেয়েটা কে, কিন্তু ত্রিরঞ্জন নিজেই তো মেয়েটাকে চেনে না। কিভাবে ওকে বলবে ওর ওই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা? দুষ্টামি করে ঢেউ ছবিটার দিকে ইঙ্গিত করে ওকে বলেছিল ‘কি ত্রিরঞ্জন-দা? ডুবে ডুবে কি জল খাচ্ছেন নাকি?’। ঢেউ-কে ত্রিরঞ্জন জানায় যে ছবিটা ও এঁকেছিল যখন ওর বয়স ১২। ত্রিরঞ্জনকে ক্ষ্যাপাবার জন্য ঢেউ ইচ্ছা করেই বলে যে, এত্ত ছোট বয়সেই এই অবস্থা? হুম্ ! সন্দেহজনক।  কথাটা ভাবতেই নিজের অজান্তেই একটু হাসি পেল ত্রিরঞ্জনের। 

 

রিক্সায় বসে এসব ভাবতে ভাবতে এবার বৃদ্ধ ভদ্রলোকের কথা মনে হল ত্রিরঞ্জনের। তিনি কেন জানতে চাচ্ছেন ও ছবির মেয়েটাকে দেখেছে কিনা? আসলেই কি মেয়েটা বাস্তবের কেউ আর ওই বৃদ্ব মেয়েটাকে চেনেন? ঠিক বুঝতে পারে না কি হচ্ছে ওর মনের ভেতর। কেন যেন কেমন একটা  অপ্রীতিকর অনুভুতি মনের গভীর কোথাও ছায়ার মতন ঘোরাঘুরি করছে। ওই দিনের ব্যাপারটা কি  আসলে বাস্তবেরই কোনও ঘটনা যার কিছু মুহুর্তের অংশ ছিল সে? 

 

নাকি মেয়েটার ছবিটা অসম্ভব জীবন্ত হয়ে উঠেছে রংতুলির আশ্চর্য ছোঁয়ায়, এটাই বৃদ্ব ভদ্রলোকের আগ্রহের কারন? বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা ত্রিরঞ্জনের মাথায় আসছে। সবকিছু খুব এলোমেলো মনে হচ্ছে। রিক্সায় বসে ত্রিরঞ্জন একটু অসুস্থ বোধ করতে থাকে। নিজের ভেতর অসংখ্য প্রস্ন এখন অক্টোপাসের মতন কিলবিল করছে যার কোনওটার  স্বস্তিকর কোনও উত্তর বা ব্যাখ্যা ওর মনে আসছে না। এসব ভাবতে ভাবতে একসময় অনেক পেছনের সেই দিনটাতে চলে গেল ত্রিরঞ্জন। ওর চোখের সামনে সেদিনের ঘটনাটা ভেসে উঠল। 

 

প্রায় ১০ বছর আগের ঘটনা, তখন ওর বয়স ছিল ১২ কিংবা তার কাছাকাছি কোনও বয়স। এখনও মনে আছে ক্যানভাসের উপর সেদিনের তারিখটা লিখেছিল। ঢাকা শহরে তখন ভীষন ঠান্ডা। সেদিন রাতে মামা আর ও রাতের খাবার খেয়ে একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিল। লেপের ভেতর যখন উষ্ণতা অনুভব করতে শুরু করেছে ঠিক তখনই ভুতে পাওয়ার মতন ছবি আঁকার ইচ্ছা চেপে বসে মাথায়। 

 

কোন এক অদৃশ্য নির্দেশে লেপের উষ্ণতা উপেক্ষা করে তখনই উঠে পড়ে ও। বরাবর যেমন হয় তার ক্ষেত্রে, তেমনই হয়েছিল সেবার। প্রথমে কোনও কিছুই সে ভাবেনি যে কি আঁকবে। কোনও এক অজানা ইশারায় হাতে তুলে নেয় ব্রাশ, রঙ কিন্তু সেদিন অন্যরকম কিছু ঘটে ওর জীবনে, যার কোনও ব্যাখ্যা ওর জানা নেই। 

 

……….চলবে 

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (৩) »

Comments

comments