অদ্ভুত ছবিগুলো (৩)

0
362
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

 অদ্ভুত ছবিগুলো (২) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

যার ছবিটা ত্রিরঞ্জন এঁকেছিল তাকে কোনও দিন দেখেনি, না বাস্তবে, না কোনও ছবিতে, না কোনও পত্রিকার পাতায়। তাহলে কিভাবে মেয়েটা ওর কল্পনায় এল? অনেক ভেবেও এর কোনও কুলকিনারা পায়নি ও।

 

বিভিন্ন সময় ত্রিরঞ্জন যেসব ছবি এঁকেছে তার কোনটিই কিছু ভেবে আঁকেনি। অনেকটা চোখ বন্ধ করে হেটে যাবার মতন ঘটেছে ব্যাপারগুলো। কি আঁকছে ও নিজেও বুঝতে পারেনি তবে ছবি শেষ হবার বুঝতে পেরেছে অদ্ভুত সুন্দর এক একটা ছবি এঁকেছে বিভিন্ন সময়।

 

সেদিন রাতে রংতুলি হাতে নিতেই সমস্ত শরীর কেন যেন খুব ভারি মনে হয়েছিল ওর। কিছুক্ষনের জন্য নিজের অস্তিত্ত হারিয়ে ফেলে ত্রিরঞ্জন । কিছু একটা ভাবার আগেই ত্রিরঞ্জন অনভুব করে অন্য একটি জগৎ ও অনুভুতি। হঠাত করেই মনে হয় ও নিজের ঘরে নেই। নিজেকে খুঁজে পায় অন্ধকার একটা রাস্তায়, হাঁটছে একজন অজানা মেয়ের হাত ধরে, কতক্ষন ওভাবে হেটেছে তা ওর মনে নেই। রাস্তাটা, মেয়েটা আর আশেপাশের সবকিছু ওর অচেনা। কিন্তু তবুও মেয়েটাকে মনে হয়েছে অনেক চেনা কেউ। অনুভব করেছে ওর হাতে ধরে মেয়েটা সম্ভবত নির্ভরতা পেয়েছে, কেন এমন অনুভব হয়েছে তা ওর অজানা।

 

মেয়েটা তাকে বলছে, আমি আর পারছি না, আমাকে একটু বসতে দাও। ভীষন অবাক হয়ে ত্রিরঞ্জুন তার দিকে তাকিয়ে থাকে অনেক্ষন। বুঝতে চেষ্টা করে ও-কি আসলেই ঠিক দেখছে এবং শুনছে, নাকি এটা নিছক একটা কল্পনার জগৎ যার একটা অংশ হয়ে আছে সে।

 

ত্রিরঞ্জন স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে মেয়েটার মুখ, চোখ, হাত, তার গায়ের লাল রঙ এর কোট। সে তো এই মেয়েটাকে চেনে না। ত্রিরঞ্জন এখানে কেন? কেন মনে হচ্ছে মেয়েটাকে সে চেনে? অপরিচিত এই মেয়েটির হাত ধরে সে কেন হাটছে? এই মেয়েটা আসলে কে? ও-তো নিজের ঘরে ছিল কিছুক্ষন আগেই। মাথাটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ওর। তারপর হঠাৎ খেয়াল হল, মেয়েটা তার হাত ছেড়ে দিয়ে রাস্তায় পড়ে গেল।

 

ত্রিরঞ্জন মেয়েটাকে ধরার চেষ্টা করেছে কিন্তু ও মেয়েটার চেয়ে অনেক ছোট, এত শক্তি কোথায় ওর। এত বড় একজন পড়ন্ত মানুষকে ধরে রাখা সম্ভব নয়। রাস্তাটা নির্জন, তাই কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকতেও পারছে না। তাছাড়া জায়গাটা ওর চেনা মনে হচ্ছে না। এদিকটায় কখনও আসেনি ত্রিরঞ্জন আগে। ওর খুব ভয় করছে। মেয়েটা ওর হাত থেকে পড়ে যেয়ে আর ওঠেনি।

 

ত্রিরঞ্জনের ভেতরে একরকমের কান্নার মতন অনুভুতি হয়। কিন্তু তবুও সে কাঁদতে পারছে না। ইচ্ছা হচ্ছে খুব চেঁচিয়ে কাউকে ডাকে কিন্তু কোনও শব্দ বের হচ্ছে না ওর মুখ দিয়ে। ভয়ে তার সমস্ত শরীর কুলকুল করে ঘামছে। মনে হল অনেক্ষন ত্রিরঞ্জন ওখানে দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক কতক্ষন তা ওর মনে নেই।

 

হঠাৎ করেই ও নিজেকে ফিরে পায় নিজের ঘরে। কতক্ষন ধরে ব্যাপারটা ঘটেছে ওর মনে নেই। কিছুই ঠিক বোধগম্য হল না ওর কাছে। ঘরের ভেতর নিজেকে আবিস্কার করার পর থেকেই কেন যেন ভয় ভাবটা চলে গেল। মনে হতে লাগল ও যেন একটা ঘোরের ভেতর থেকে এসব দেখেছে, পুরোটাই কাল্পনিক একটা ঘটনা। ত্রিরঞ্জনের অবচেতন মন ওকে আর কিছু ভাববার অবকাশ দেয়নি। অদ্ভুত কোনও এক ইশারায় ত্রিরঞ্জন মেয়েটার ছবি আকা শুরু করে। জানা নেই কেন, শুধু মনে আছে পুরো ঘটনাটা।

 

ছবিটা আঁকতে আঁকতে কখন যে রাত চলে গেছে তা ও বুঝতে পারেনি। তবে এটুকু অনুধাবন করতে পারে যে অদ্ভুত একটা ঘোরের ভেতর সবকিছু করেছে। থার্মোমিটারে তাপমাত্রা নিলে হয়ত দেখা যাবে তার গায়ে হাসপাতালে শুয়ে থাকবার মতন জ্বর কিন্তু ত্রিরঞ্জন কিছুই অনুভব করতে পারেনি। সেই শীতের রাতেও বেশ কয়েকবার শরীর থেকে ঘাম ঝরেছে কুলকুল করে এবং সেটা ওর শরীরেই শুকিয়েছে নিজেরই অজান্তে। একসময় ওর ছবি আঁকা শেষ হয়েছে। আঁকা ছবিটার দিকে অনেক্ষন ধরে তাকিয়ে ছিল ও।

 

ছবির মেয়েটার সাথে তার দেখা মেয়েটার চেহারা, বেশভুষার অদ্ভুত মিল। এত মিল, যে ও নিজেই ভীষণ চমকে যায়। কোথাও এক চিলতে পার্থক্য নেই। যদিও ত্রিরঞ্জন তখন জানে যে ছবি আকার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ওর আছে কিন্তু তারপরও এই ছবিটা অন্য সব ছবিগূলোকে যেন ছাড়িয়ে গেছে। জীবন্ত একটা মানুষ ওর সামনে, যাকে কিছুক্ষন আগেই ওর অজানা কল্পনার জগতের কেউ মনে হয়েছে এখন তাকেই ওর সামনে দেখছে।

 

অনেক্ষন ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর সমস্ত অনুভুতির ভেতর আবারও কেমন একটা ভয়ের ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। ছবিটার প্রত্যেকটা অংশ ভীষণ রকমের নিঁখুত। ছবির রাস্তাটা পর্যন্ত মনে হচ্ছে নির্জন ও আলো-আঁধারির মিশ্রন, ঠিক যেমনটা ও দেখেছিল। কখন যে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায় ওর মনে নেই।

 

মামা সারারাত ঘুমিয়েছে নিজের ঘরে, কিছুই টের পাননি। মামার ঘুমটা বরাবরই খুব গভীর। পুরো বাড়িটা ডাকাতি হয়ে গেলেও উনি টের পাবেন না। ভোর বেলা বুয়া এসে ঘরের কাজকর্ম শুরু করে। তখন ত্রিরঞ্জনকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে সাথে সাথে মামাকে ডেকে আনে।

 

থার্মোমিটারে তাপমাত্রা নিতেই দেখা যায় গায়ে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর। ভয় পেয়ে তখুনি ওকে হাসপাতালে নিয়ে যান উনি। পুরো একটা সপ্তাহ ওকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল সেবার। ডাক্তারদের ধারনা অনেক ঠান্ডা লেগে এমনটা হয়েছিল কিন্তু ত্রিরঞ্জন জানে এই জরটা ঠান্ডা থেকে আসেনই। সম্ভবত খুব ভয় পেয়ে যায় ত্রিরঞ্জন যখন কল্পনার কিংবা ভ্রমের জগতে দেখা মেয়াটার সাথে ওর আঁকা ছবিটার এত মিল দেখে।

 

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে ত্রিরঞ্জন ছবিটা দেখল আবার। ঠিক যেখানে শেষ করেছিল সেখানেই ইজেলের উপর পড়ে আছে কারন ওর ঘরের কোনও কিছু কেউ কখনও নাড়া চাড়া করে না। যেখানে যে জিনিসটা রাখা হয় সেটা সেখানেই পাওয়া যায়। মামা তাকে অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছেন এমন একটা ছবি তাকে কেউ আঁকতে বলেছে কিনা, মেয়েটাকে সে চেনে কিনা, কোথায় দেখেছে, সারারাত ঘুমায়নি কেন, ইত্যাদি নানান প্রস্ন যার কোনওটির উত্তর সে নিজেও জানে না। জানা নেই, কিভাবে এই ছবি ও এঁকেছে, কেনইবা মেয়েটাকে সে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে, কিভাবে ওমন একটা ঘোরের ভেতর নিজেকে দেখতে পায় – কিছুই ওর জানা নেই। তাই মামাকে কিছুই বলতে পারেনি, চুপ করে তার প্রস্নবান শুনে গেছে।

 

যদিও ব্যাপারটা নিয়ে বেশ কিছুদিন মামা একটু হইচই করেছেন, রীতিমতন ওকে অতিষ্ট করে ফেলেন তিনি প্রস্নের পর প্রস্ন করে। ওর নিরবতা দেখে একসময় তিনি আর এ বিষয়ে কথা বলেননি। হয়ত বুঝেছেন ছোট্ট ত্রিরঞ্জনের ওসব প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। কিন্তু ত্রিরঞ্জনের স্পষ্ট ধারনা তিনি হয়ত ওর অদ্ভুত সব ব্যাপারগুলো নিয়ে সবসময় ভাবেন তবে কিছুই জিজ্ঞাসা করেন না।

 

আজ এত বছর পরে আবার সেই প্রশ্নগুলো ওর মনের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। মাথা থেকে কোনও ক্রমেই ভদ্রলোকের ভাবনাটা যাচ্ছে না। হয়ত অহেতুক বেশি বেশি ভাবছে ও এটা নিয়ে। রিক্সাটা বাসার সামনে আসতেই ভাড়া মিটিয়ে নেমে যায় ও।

 

বাসায় ফিরে খুব ক্লান্ত বোধ করে ত্রিরঞ্জন। বিছানায় চুপচাপ অনেক্ষন শুয়ে থাকে। এই ব্যাপারটা ত্রিরঞ্জন বেশ উপভোগ করে। অনেক ক্লান্তির পর যখন বিছানায় হাত-পা মেলে শুয়ে থাকে তখন অন্যরকম একটা প্রশান্তি কাজ করে ওর মনের ভেতর। সম্ভবত সেই প্রশান্তি ওর সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে যায় একসময়। তখন আর উঠতে ইচ্ছা হয় না বিছানা থেকে। অসম্ভব ক্ষিধা নিয়েও কিছু খেতে ইচ্ছা হয় না । আবার ক্ষুধা নিয়ে বেশিক্ষন ওভাবে শুয়ে থাকাও যায় না। অনিচ্ছাস্বত্তেও গোসল সেরে ডাইনিং টেবিলে চলে আসে ও। বুয়া রান্না শেষ করে সমস্ত খাবার টেবিলে ঢেকে রেখে যান। খাবার এখনও বেশ গরম আছে ।

 

খেতে খেতেই ত্রিরঞ্জন মনে মনে সিদ্বান্ত নিল হাসানের সাথে দেখা করতে হবে একবার। হয়ত হাসানের সাথে সরাসরি কথা বললে জানা যাবে ব্যাপারটা কিছুই না, নিতান্তই ভদ্রলোকের কৌতুহল। আচ্ছা ! ও কি খুব বেশী ভাবছে ব্যাপারটা নিয়ে?

 

নিজের ঘরে ফিরে একটা বই নিয়ে বিছানায় এল ত্রিরঞ্জন। মাথাটা খুব বেশি এলোমেলো মনে হচ্ছে। বই এর মধ্যে ডুবে থাকতে পারলে হয়ত ভাললাগবে। এটাকে বলা যায় খুব সহজ কৌশলে মনকে ধোঁকা দেয়া। টেকনিকটা কোথাও যেন পড়েছিল যে মানুষের মন নিজেই নিজের বিক্ষিপ্ত অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এক রকম খেলা খেলে। খেলার নিয়ম অনুযায়ী মন তার পছন্দের কিছু একটা বেছে নেয় নিজেকে বিক্ষিপ্ত অবস্থা থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য। সম্ভবত সেই নিয়মের কারনেই ত্রিরঞ্জনের মন এখন বই এর ভেতর ডুব দিতে চাইছে।

 

প্রথম কয়েক পাতায় খুব একটা মনোযোগ দিতে পারল না কিন্তু অনেকটা জোর করেই পড়ে যেতে থাকল। এই জোর খাটিয়ে পড়ে যাওয়া – এটাও কি মনের নিজস্ব খেলার একটা অংশ? চিন্তাধারার একটা পথ থেকে অন্য পথে চেতনার প্রবেশ হয়ত একটু সময় সাপেক্ষ ব্যাপার, তবে মন নিজের স্বার্থেই এটা করে। আর এ জন্য প্রয়োজন মনের চেতন অংশকে অবচেতন অংশের মাধ্যমে পরিচালনা করা। ত্রিরঞ্জনের অবচেতন মন তাই খুব ধীরে বইএর জগতে পুরোপুরি প্রবেশ করে ফেলে।

 

তারপর একসময় বইটার ভেতরে সুম্পুর্নভাবে ডুবে যায় ও। আফ্রিকার মালির ডগন উপজাতির সাথে সাইরাস গ্রহের অতিবুদ্ধিমান অ্যালিয়েনদের সম্পর্ক, যোগাযোগ, ওদের সমাজ ব্যবস্থা আর ধর্মীয় প্রচলন এর উপর অ্যালিয়েনদের প্রভাব – এসবের উপর লেখা একটা বই। দুজন ফ্রেঞ্চ আর্কিওলজিষ্ট মালির ডগনদের সাথে বহুবছর থেকে তাদের অসাধারন অ্যাষ্ট্রনমিকাল জ্ঞান আর তাদের হাজার বছর ধরে প্রচলিত লিজেন্ডের উৎস খুঁজে বের করে। তিন হাজার বছরের পুরনো মন্দির থেকে পাওয়া বিভিন্ন স্ক্রলগুলো অনুবাদ করতেই চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য বের হয়ে আসে। জানা যায় কিভাবে অ্যালিয়েনদের কাছ থেকে ডগনরা Sirius গ্রহ সম্পর্কে জানতে পারে।

 

ত্রিরঞ্জনের মনের চেতন অংশ যখন পুরোপুরি ওর মনের অবচেতন অংশের দখল নিয়ে নেয় তখন ধীরে ধীরে ঘুমের রাজ্য ওকে গ্রাস করে। চোখের পাতা একটু ভারী হয়ে আসতেই বইটা পাশে রেখে চোখ বন্ধ করে ও। তারপর একসময় ত্রিরঞ্জন ঘুমিয়ে পড়ে।

……………চলবে

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (৪) »

Comments

comments