অদ্ভুত ছবিগুলো (৪)

0
405
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

অদ্ভুত ছবিগুলো (৩) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

আজ মঙ্গলবার।বাইরে অসম্ভব মন খারাপ করা একটা ভোর।মঙ্গলবারে সব কিছুই মঙ্গলময় হবার কথা।কিন্তু দিনের শুরুটাই অমঙ্গলময় মনে হচ্ছে।কুটকুটে কাল অসংখ্য মেঘে আকাশ ছেয়ে আছে, যেন রবীঠাকুরের সারাজীবনের সমস্ত লেখার কালিগুলো কেউ ঝপাং করে আকাশে ঢেলে দিয়েছে।ঝমঝম বৃষ্টিতে সমস্ত ঢাকা শহর সারারাত স্নান করেছে।এখন ক্লান্ত বৃষ্টি ঝিরঝির করে ঝরছে, সাথে শোঁ শোঁ আওয়াজে বাতাস বইছে।

 

পল্লবীর একটা অতি জ্বরাজীর্ন হলদে রঙের একতলা তিন কামরার বাড়ি।বাইরে বসার ঘরে সস্তার একসেট বেতের সোফা, কয়েকটি চেয়ার আর আটপৌরে একটা বিছানা।উপরে টিনের চালে বৃষ্টির একটানা গান হয়েছে সারারাত।এখন ক্লান্তিতে গুনগুন করে গাইছে, মাঝে মাঝে বেশ বেসুরো। 

 

ঘড়িতে ঠিক ৪টা বাজে।টিনের চালে বৃষ্টির খেলার সাথে সেকেন্ডের কাটার টিকটিক শব্দ বেশ একটা ছন্দ তৈরি করেছে।সেই সাথে তাল মিলিয়ে হাসানের খুব ইচ্ছা করছে একটু শিষ দিতে কিন্তু রাতের ঠিক এই শেষ মুহুর্তে ব্যাপারটা শোভন নয়।তাছাড়া ভেতর থেকে অনবরত কাশির শব্দ এসে একটা ছন্দপতন ঘটাচ্ছে।আজ প্রায় তিনমাস হল বাবার কাশি এবং দিনদিন এটা বেড়েই চলছে।এ ব্যাপারে বাবাকে খুব একটা চিন্তিত মনে হচ্ছে না, তবে হাসান খুবই আতঙ্কগ্রস্থ।বাবাকে খুব ভাল একজন ডাক্তার দেখাতে হবে এবং খুব শিগ্রিই দেখানো দরকার। 

 

কিছুক্ষন হল বাবার কাশিটা আর শোনা যাচ্ছে না, সম্ভবত বৃষ্টির মতই ক্লান্ত হয়ে কাশিটা ঘুমিয়ে পড়েছে।আজ আর হাসানের ঘুম আসবে না।প্রায় আধাঘন্টার মতন হয়েছে তার ঘুম ভেঙ্গেছে আর তখন থেকেই তীব্র একটা প্রতীক্ষা শুরু হয়েছে।বৃষ্টির জন্য রাতে সব জানালা বন্ধ করে দিয়েছিল তাই ঘুম ভাঙ্গতেই উঠে যেয়ে পায়ের দিকের জানালাটা একটু খুলে দিয়েছে হাসান।ভোরবেলার ঠান্ডা সতেজ বাতাসটা ওর খুব প্রিয়।বৃষ্টির বেগ কমে যাওয়ায় ঘরের ভেতর পানির ঝাপ্টা আসছে না। 

 

হালকা সবুজ রঙের ফতুয়া আর সাদা একটা পায়জামা পরে আছে সে।টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা টেনে নিয়ে আধশোয়া হয়ে তৃপ্তির সাথে খেল।সাথে সাথেই একটা সিগারেটের নেশা পেয়ে বসল তাকে।সস্তার সিগারেটের প্যাকেটটা টেনে নিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে দীর্ঘ একটা টান দিল হাসান।তারপর ঠোঁট গোল করে কয়েকটা ধোঁয়ার বলয় ছেড়ে দিল টিনের চালের দিকে।ধোঁয়ার উর্ধগতির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হাসান অনুভব করল তার সাফল্যের উত্তোরন।সবেমাত্র শুরু হয়েছে সাফল্যের মুখ দেখা।মুখে তার স্মিত হাসি, ঠোঁটের কোনা দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। 

 

সম্ভবত বাবা উঠেছেন, এখন তার পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।বাথরুম থেকে পানির শব্দ, এরপর তার কাশি।পায়ের শব্দ আবার বাবার ঘরের দিকে গেল।বাবা চেয়ার টেনে বসলেন ।হাসান জানে এখন বাবা চা খেতে চাইবেন।ওর নিজেরও ইচ্ছা হচ্ছে চা খেতে।অপেক্ষার সময়টায় এমন হয়।বারবার চা খেয়েও মনে হয় চা খাওয়া দরকার।অন্যদের এমন হয় কিনা ওর জানা নেই তবে ওর হয়।ওর জানতে ইচ্ছা হয় অপেক্ষা আর চা – এ দুটোর ভেতর কোনও সম্পর্ক আছে কিনা।নাকি অপেক্ষার সময় মন কিছু নিয়ে ব্যাস্ত থাকতে চায় বলেই এমনটা হয়? 

 

 

বাবার ডাক শোনা গেল।হাসান, এই হাসান ! শুনছিস ? 

 

শুয়েই উত্তর দিল হাসান, হ্যাঁ বাবা, বল। 

 

আমাকে এক কাপ চা খাওয়াতে পারিস? একটু আদা দিবি চায়ের মধ্যে।

 

ঠিক আছে বাবা।তুমি বস, আমি চা করে আনছি। 

 

হাসান উঠে পড়ল বিছানা থেকে তারপর রান্নাঘরের দিকে গেল।চুলায় গরম পানি দিয়ে আদা কুচি করে বাবার নির্দিষ্ট মগে ফেলল।বাবা বরাবরই দুধ-চিনি ছাড়া চা খান তবে ইদানিং মাঝে মাঝে একটু আদা নেন, যেমন সকালের চায়ে তাকে একটু আদা দিতে হয়।আদা দিয়ে চা খেলে নাকি কাশি ভাল হয়ে যায়, এই বিশ্বাসেই তিনি আদা মিশ্রিত চা খাওয়া শুরু করেছেন।হাসানের নিজেরও ধারনা আদা মিশ্রিত চায়ে কাশির উপশম হয়।ঠান্ডা লেগে একটু কাশি হলেই হাসান এই পদ্বতিতে বেশ উপকার পেয়েছে। 

 

চা বানিয়ে নিয়ে হাসান বাবার ঘরে চলে এল।এই নাও বাবা তোমার চা।তোমার কি শরীর খুব খারাপ? আজ সারারাতই তুমি কেশেছ।ভাবছি তোমাকে ভাল একজন ডাক্তার দেখাব খুব শিগ্রিই। 

 

এই বয়সে আর শরীরের খারাপ-ভাল কিরে? তবে কাশিটা মনে হয় খুব বেড়েছে।হ্যাঁ, একবার ডাক্তার দেখানো দরকার মনে হচ্ছে কিন্তু আমার কাশির কথা বাদ দে।তোর ব্যাবসার কি অবস্থা বল? নতুন কোনও ছবির খোঁজ পেলি? আগের সব ছবিগুলো কি বিক্রি হয়েছে?  

 

বাবা, এই ব্যাবসাটা খুব সহজ নয় তবে একবার লাইনে পড়ে গেলেই হল।পরিশ্রম অনেক বেশি আর রিটার্নটা তেমন নয়।অনেক কষ্ট করে যেসব ছবি জোগাড় করি সেগুলোর ক্রেতা আবার সংখ্যায় খুব কম।সবাইতো আর ছবির ব্যাপারটা ওভাবে বোঝে না। 

 

কেন, আজকাল কি ছবির ভক্ত কমে গেল নাকি?  তবে তুই   ঠিকই বলেছিস, ছবির ক্রেতারা খুব সিলেক্টিভ হয়।যারা কেনে, তার সবসময়ই কেনে।কিন্তু সমস্যা হল, বেশিরভাগ ক্রেতারাই নামিদামি শিল্পীদের ছবি কিনতে চায়। 

 

ঠিকই বলেছ বাবা ।তবে আশার কথা হচ্ছে, এ ধরনের ছবি যারা কেনে তারা রেগুলার কাষ্টমার।কিন্তু দাম খুব কম পাওয়া যায়।কিছুকিছু ছবি অবশ্য বেশ ভাল দামেই যায়। 

 

হু! নামিদামি শিল্পী না হলে কি কেউ আর দাম দিতে চায়, যতই ভাল ছবি আঁকুক না কেন। 

 

তা ঠিক বাবা।তবে এই ছবিগুলোর ক্রেতারা বেশিরভাগ সময় এখন আমার কাছে আসে কারন খুব কম ব্যবসায়ী আছে যাদের কাছে এমন ছবির কালেকসান আছে।আমিতো নামিদামি শিল্পীদের ছবি রাখি-না।তবে আমার প্রত্যেকটা ছবি যাদের আঁকা তাদের হাত অসামান্য।বলতে পার ছবি আঁকার প্রতিভা নিয়েই এরা জন্ম নিয়েছে কিন্ত ওরা নিজেরাই তা হয়ত জানে না। 

 

বেশ গম্ভীর একটা নিঃশ্বাস ফেললেন কালান সাহেব।বললেন তাহলে তো বেশ ভালই।দেখবি খুব তাড়াতাড়িই ব্যবসাটা দাঁড়িয়ে যাবে।আর এদেশে চাকরির যে অবস্থা তাতে ব্যবসাটা কোনওরকম চললেও চাকরির চেয়েও বেশ ভাল। 

 

এই জন্যই তো আর চাকরির পেছনে ছুটোছুটি করিনি বাবা।এদেশে চাকরি ব্যাপারটা নিতান্তই ভাগ্য, ঘুষ কিংবা প্রভাবশালী আত্মীয়স্বজন ছাড়া সম্ভব না। 

 

চাকরির কথা আর কি বলব রে! স্কুল-কলেজের পড়াশুনাই তো এখন ঘুষ দিয়ে হয় শুনছি! 

ঠিকই শুনেছ বাবা, তবে পুরনো জিনিস নতুন মোড়কের মতন! 

 

কাশতে কাশতেই বাবা বললেন, মানে? নতুন মোড়কটা আবার কি?

 

বাবা, এটা হচ্ছে  Donation ।যে কোনও স্কুলে কিংবা কলেজেই যাও, এখন আর Donation ছাড়া ভর্তি সম্ভব না।আর Private University গুলোতেও একই অবস্থা! ওখানে টিউশান ফি ছাড়াও Donation তো দিতেই হয়! 

 

হুম, তাইতো শুনি ইদানিং সবার কাছে।অথচ একসময় দেশে পড়াশুনা, চাকরির অবস্থা এমন ছিল না রে।আচ্ছা, একটা কথা বলত হাসান? আমি প্রায়ই ভাবি এরকম একটা ব্যবসার বুদ্ধি তোকে কে দিল!  

 

ইউনির্ভাসিটিতে পড়বার সময় আমার এক বন্ধুর চাচা এমন কিছু অরিজিনাল পেইন্টিং খুঁজছিল যেগুলো নামি কোনও আর্টিষ্টের নয় কিন্তু অসামান্য হতে হবে।আর্টিষ্ট নতুন কিংবা যার কোনও নাম-যশ নেই এমন হতে হবে এবং ছবিগুলো হতে হবে একদমই অন্য রকমের।উনি ছবি বিশেষজ্ঞ, ছবি দেখেই নাকি বলে দিতে পারেন কোন ছবি কেমন। 

 

তুমি তো ত্রিরঞ্জনকে চেন! ওর আঁকার হাত অসাধারন।যদিও সবসময় ও ছবি আঁকে না। 

 

হুম, জানি তো, কিন্তু এত ভাল হাত থাকা সত্তেও কেন যে ছেলেটা সবসময় আঁকে না। 

 

আমিও জানি না বাবা।কিন্তু ওর পেইন্টিংগুলোর মধ্যে কিছু একটা থাকে।ছবিগুলো এত জীবন্ত যে তুমি না দেখলে বিশ্বাস করবে না বাবা।ওরই আঁকা কয়েকটা ছবি জোগাড় করি সেই সময়।ভদ্রলোক ছবিগুলো অসম্ভব পছন্দ করেন এবং বেশ ভাল দাম দিয়েই ওগুলো কিনে নিয়ে যান। 

…….. চলবে

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (৫) »

Comments

comments