অদ্ভুত ছবিগুলো (৬)

0
321
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

অদ্ভুত ছবিগুলো (৫) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

আজ ঘুম ভেঙ্গেছে অনেক আগেই কিন্তু উঠতে ইচ্ছা হচ্ছে না ত্রিরঞ্জনের। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে অবুঝের মতন, সাথে কান্নার মতন বাতাস। বেশ ঠান্ডা একটা আবহাওয়া। কাল রাতে ভাল ঘুম হয়নি ওর। বার বার দুঃস্বপ্নের মতন কিছু অসংলগ্ন স্বপ্ন দেখেছে যেগুলোর কোনও মানে নেই। বেশিরভাগ স্বপ্নেরই হয়ত কোনও মানে থাকে না। তবুও অনেকেই সেগুলোর কোনও একটা ব্যাখ্যা খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।

 

ঝিম মেরে কাঁথার নিচে শুয়ে শুয়ে টেলিফোনটার অবিরাম বাজনা শুনছে। বেশ অনেকবার বেজে তারপর একসময় সকালের নিরবতা মেনে নিয়েছে ফোনটা। যে ফোন করেছে তার ধৈর্য অনেক কম, তা-না হলে আবার ফোন করত সে। অনেকদিন হল এটা ভুলেই ছিল ত্রিরঞ্জন, গতকাল মুকুলের প্রস্নে বারবার সেই রাতের কথাই মনে হয়েছে ওর। সম্ভবত এজন্যই অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখেছে সারারাত যেগুলো আসলে দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়।

 

শুয়ে শুয়েই আবার ভদ্রলোকের কথা, ছবি আর ছবির মেয়েটার কথা ভাবল ও। কি যেন কিছু একটা ওর মনের মধ্যে টোকা দিচ্ছে। কেমন অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি, ও নিজেও ঠিক বুঝতে পারছে না। কি যেন আসি আসি করেও ঠিক ধরা দিচ্ছে না। মনের কোনায় কিসের যেন একটা ইঙ্গিত বারবার ওর পিছু নিচ্ছে। বৃষ্টিস্নাত ভোরের এই ঠান্ডার মধ্যেও হঠাৎ অনুভব করল ওর সমস্ত শরীর ঘামছে। মনে হচ্ছে গায়ে অনেক জ্বর এখন।

 

কেন যেন মনে হচ্ছে হয় অশুভ কিছু ওর জন্য অপেক্ষা করছে। ছবিটাকে ঘিরে হয়ত কিছু একটা ব্যাপার আছে যা ওর অজানা। ছবিটা আঁকবার আগে অদ্ভুতভাবেই ও মেয়েটাকে দেখেছিল। হঠাৎ ওর একটা জিনিস খেয়াল হল। এই ছবি আঁকার ব্যাপারটার সাথে মিল আছে অন্য আরো কিছু ছবি আঁকার ঘটনার সাথে।

এরপর যতবার এমন হয়েছে তখনকার কথা ভাবল ত্রিরঞ্জন। একদিনের ঘটনা চলে এল চোখের সামনে। তখন ইউনির্ভাসিটিতে পড়ে ও। ফিজিক্স ক্লাস শেষে যখন দোয়েল চ্বত্তর পেরিয়ে ফুটপাত ধরে হাটছিল তখন হঠাৎ করেই তার মনে হয়েছিল ছবি আঁকতে হবে এবং এখুনি আঁকতে হবে। নিজের ভেতর এক অদ্ভুত পরিবর্তন টের পায় তখন সে। মনে হয় কে যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অজানা এক পথিবীতে। কখন যে বাসে চেপে বসেছে, বাড়ির কাছের বাসষ্টপে নেমেছে তারপর হেঁটে বাসায় এসেছে ওর মনে নেই। একটা ভীষণ রকমের ঘোরের ভেতর ছিল ও।

 

এই রকমের ঘোরলাগা অনুভূতি ওর আরো কয়েকবার হয়েছিল কিন্ত এটা নিয়ে পরবর্তীতে আর তেমন একটা ভাবেনি ও। কারন অনেকদিন হল ওর আর এমন ঘোরলাগা অনুভুতি হয়নি। এরপরও ছবি সে এঁকেছে অনেকবার এবং প্রত্যেকবারই সে ডুবে গেছে অন্য কোনও জগতে। নেশায় বুঁদ হয়ে গেছে একেকটা ছবি আঁকার সময় কিন্তু এমন অদ্ভুত ঘোরলাগা অনুভুতি হয়েছে অল্প কিছু ছবি আঁকার সময়।

 

সেদিন ইউনিভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরে অন্যরকম একটা ঘোরের ভেতর সে তুলে নেয় রংতুলি আর রঙের ভান্ডার, অনেকটা নিজের অজান্তেই যেন এমনটা হয়। ক্যানভাসের সামনে দাড়াতেই সেদিন হঠাৎ করেই ওর সমস্ত পৃথিবী দুলে উঠে। হুবহু একই রকমের একটা অনুভুতি শুরু হয়। তখন অবশ্য মনে হয়নি অনেক আগের ঘটে যাওয়া ওই ঘটনা, কারন ওর নিজের কোনও নিয়ন্ত্রন নেই এটার উপর।

 

এর আগে কখনই ও খুব একটা ভাবেনি যে এই দুই ঘটনার মধ্যে কেমন যেন একটা মিল আছে। ছবিটা শুরু করার সময়ে সে ভাবেনি ঠিক কি আঁকবে। শুধু মনে হয়েছে ছবি আঁকতে হবে। তারপর হঠাৎ করেই অদ্ভুত সেইরকম ঘোরলাগা অনুভুতি। নিমেষে ও চলে যায় অন্য কোনও জগতে। হঠাৎ করেই ত্রিরঞ্জন চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পায় গ্রামের ছোট্ট একটা পথ দিয়ে হাঁটছে সে। একসময় চলে আসে একটা শিমুল গাছের নিচে। জায়গাটা তার চেনা নয়। সময়টা দুপুর কিংবা বিকালের কাছাকাছি, কিন্তু শিমুল গাছটার নিচে মনে হয় অনেক আগেই সন্ধ্যা নেমে গেছে। কেমন যেন অন্ধকার একটা ভাব ওখানটায়।

 

কান পেতে শুনতে পায় পাতার মচমচ শব্দ। ঘুরে তাকাতে দেখে একটা ছোট্ট ছেলে দাঁড়িয়ে। ছেলেটার বয়স ১০ কিংবা তার একটু বেশি হবে। ওকে কি যেন বলছে হাত নেড়ে নেড়ে কিন্তু সে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। তারপর মনে হল চেঁচিয়ে কি যেন বলছে ছেলেটা ওকে কিন্তু তবুও কিছুই শুনতে পাচ্ছে না ও। ত্রিরঞ্জন হাটতে হাটতে এগিয়ে যেতে থাকে ছেলেটার দিকে। একটু কাছে আসতেই ওর মনে হয় ছেলেটার শরীরটা খুব দুর্বল। তারপর দেখল ছেলেটা পড়ে যাচ্ছে আর চিৎকার করছে। ত্রিরঞ্জন এবার দৌড়ে চলে আসে ছেলেটার পাশে। কিন্তু তার আগেই ছেলেটা পড়ে যায় পাতার নরম বিছানায়। তারপর মনে হয় কোনও অজানা জগতে হারিয়ে যায় ছেলেটা। এরপর ওর আর কিছু মনে নেই।

 

যখন হুঁশ ফেরে তখন খেয়াল হয় ওর হাতে তুলির নাচন। তুলির আর রঙের অদ্ভুত খেলায় মেতে ওঠে সে। রংতুলি হাতে ত্রিরঞ্জনের ভেতর শুরু হয়েছে অপার্থিব এক সুরের তোলপাড়। ভায়োলিনের পাগল করা সুর যেমন সমস্ত অনুভূতিকে তোলপাড় করে দেয়, ঠিক তেমনি একরকম পাগল করা রঙের খেলায় ত্রিরঞ্জনের সমস্ত চেতনা অচেতন হয়ে আছে। নিজের অজান্তেই চলে তুলির আর রঙের মুহুর্মুহু আক্রমন ক্যানভাসের উপর।যেন প্রচন্ড দক্ষ কোনও শিল্পীস্বত্তা সৃষ্টির মায়াজালে বিন্যস্ত।

 

একের পর এক রঙ এর আঁচড়ে জীবন্ত হয়ে ভেসে উঠছে মায়াবী চোখের ওই ছেলেটা। ওর বড় বড় সুন্দর চোখ, মাথাভর্তি চুল আর মলিন মুখায়ব। শুকনা পাতার রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া ছেলেটার ছবিটা অসম্ভব রকমের জীবন্ত হয়ে ফুটে ওঠে ।

 

মনে হচ্ছে ত্রিরঞ্জনের ক্যানভাস নয়, সামনেই ওর দেখা সেই গ্রামের শিমুল গাছের নিচে পাতার রাজ্য হারিয়ে যাওয়া ছেলেটা পড়ে আছে। ছবিটাতে মনে হচ্ছে ছেলেটা কি প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। যখন তার ছবি আঁকা শেষ হয় তখন প্রায় ভোর রাত। ক্যামন একটু শীত শীত করে উঠে ওর। সারা বিকাল, সন্ধ্যা, রাত কিভাবে কেটেছে ওর মনে নেই। মামা কি ওর ঘরে এসেছিল? মনে নেই।

 

নিজের ঘরে বসে ত্রিরঞ্জনের সমস্ত শরীর কুলকুল করে ঘামছে। গায়ে অসম্ভব জ্বর, মনে হচ্ছে এখুনি পড়ে যাবে ও। তবুও ছবিটা শেষ হবার পর অনেক্ষন চেয়ে থেকেছে ছবিটার দিকে।তার দেখা ছেলেটার সাথে কোথাও একচুল কোনও পার্থক্য খুঁজে পায়নি সে। ছবির ছেলেটাও ওর ঘোরের মধ্যে দেখা ছেলেটার মতন, বড় বড় মায়াবী চোখ আর মাথা ভর্তি অসম্ভব সুন্দর চুল। চোখদুটো ভীষণ রকমের সুন্দর আর ঝিকমিকে। কিন্তু সমস্ত মুখের ভেতর একটা কষ্টের অভিব্যাক্তি আছে। অনেক্ষন খেয়াল না করলে এই ব্যাপারটা ধরা যায়-না। ঠিক যেমনটি ত্রিরঞ্জন দেখেছিল ওর ঘোরের ভেতর, মলিন একটা মুখ।

 

একটানা প্রায় ৪ দিন ও জ্বরে পড়ে ছিল সেবার। শুধু মনে আছে মামা ওই ক’দিন চোখমুখ কাল করে ঘুরে বেড়িয়েছে। মামার কিছু কথা ওর এখনও মনে আছে। কারন প্রস্নগুলো হয়ত ওর নিজের মনের মধ্যেও ইদানিং হয়। ও জানে মামা ওকে নিয়ে এখন খুব ভয়ে থাকে। যদিও এরপর আবার অনেকদিন ওর এমন কিছু হয়নি।

 

ত্রিরঞ্জনের মনে পড়ে এই দু’বারই তার ছবি শেষ করার পর অসম্ভব জ্বর হয়েছিল। আরও একটা জিনিস ওর কাছে একটু খটকা লাগে। এই দু’বারই ওর দেখা মানুষ দু’জন পড়ে যায়, শুধু জানা নেই ওরা কি অচেতন হয়ে পড়ে যায় নাকি মারা যায়! আবার এমনও হতে পারে যে দুটো ঘটনাই যেহেতু একটা ঘোরের ভেতর ঘটে, তাই দু’বারই ও দেখেছে যে মানুষ দু’জন পড়ে যায়। হয়ত কোনওভাবে ওর অবচেতন মন এভাবেই ঘটনা দু’টো সাজিয়েছে। মানুষ নানা ধরনের কাজ করে থাকে বিভিন্ন সময় কিন্তু সবকিছুর ভেতর একটা প্যাটার্ন থাকে। ওর অবচেতন মনে হয়ত এমনই একটা প্যাটার্ন আছে।

 

কিন্তু ওর জীবনের দুটো বিচ্ছিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া এই ব্যাপারটা ওকে কখনও এতটা বিচলিত করেনি যতটা করছে আজ। বৃদ্ধ্ব ভদ্রলোকের কথা মনে হচ্ছে বারবার। কেন তিনি ওর সাথে দেখা করতে চান, কেন এত দাম দিয়ে ওই ছবিটা উনি কিনেছেন, এইসব মনে হচ্ছে বার বার। এমনও হতে পারে ছবিটা তার অসম্ভব পছন্দ হয়েছে তাই শিল্পীর সাথে দেখা করতে চান!

 

কিন্তু তারপরও মনের ভেতর কেমন একধরনের অনুভূতি হচ্ছে যেটা ঠিক শুভ মনে হচ্ছে না ওর কাছে। কেন এমন হচ্ছে ওর? শুধু বুঝতে পারছে অনুভূতিরা নিয়ন্ত্রনহীন এখন। হঠাৎ করেই ভীষণ ইচ্ছা হল ঢেউ এর সাথে ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করতে। ও নিজেও বলতে পারবে না কেন এমন তীব্র ইচ্ছা হচ্ছে ।

সকাল ন’টার কিছু বেশিই বাজে। এসময় ঢেউকে হয়ত বাসায় না-ও পাওয়া যেতে পারে তবু একবার চেষ্টা করতে দোষ কি! বাসায় না পেলে ইউনিভার্সিটির দিকেও খুঁজে দেখা যেতে পারে।

 

আসাদ গেটের সামনে আসতেই কি ভেবে রিকসা দাড় করাল ত্রিরঞ্জন। ফুলের দোকান থেকে বেশ অনেকগুলো রজনীগন্ধা কিনল। দোকানে আরও অনেক রকম সুন্দর সুন্দর ফুল আছে, যেমন টকটকে লাল রঙের গোলাপ, অন্যান্য আরো কিছু সুন্দর ফুল যাদের বেশীরভাগেরই নাম জানে না ও। কোনও কিছু না ভেবেই রজনীগন্ধা নিল ও।

আজ পর্যন্ত কখনও কারও জন্য ফুল কেনেনি ও। বহুবার মুকুলদের বাসায় গেছে ও কিন্তু কোনওদিন ঢেউ এর জন্য ফুল নেবার কথা মনে হয়নি। তাহলে আজ কেন হল? ও কি কোনও ঘোরের ভেতর এসব করছে? নাকি এখনও বিছানায় শুয়ে ভাবছে আর তার ভাবনার এই অংশে সে ফুল কিনছে?

 

একটা ঘোরলাগা অনুভুতি নিয়ে মুকুলদের বাসার সামনে এসে হাজির হল ত্রিরঞ্জন। ভাবছে হয়ত ঢেউ বাসায় নেই। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে কিলিংবেল টেপার আগেই ঢেউ দরজা খুলে দিল। মুহুর্তের জন্য ত্রিরঞ্জন কোনও কথা খুঁজে পেল না, বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে শুধু ঢেউ এর দিকে তাকিয়ে থাকল, মুখে বিব্রত হাসি।

………… চলবে

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (৭) »

Comments

comments