অদ্ভুত ছবিগুলো (৭)

0
276
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

অদ্ভুত ছবিগুলো (৬) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

ঢেউ এর মনে হল ওর জীবনে এর চেয়ে সুন্দর কোনও সকাল আর কখনও আসবে না। ওর চেতনার অলিতে গলিতে যে অনুভূতিগুলো তারা নিমেষেই কেমন যেন বিবশ আর অচেতন হয়ে গেল। শুধু অনুভব করতে পারল ওর স্বত্তার অনেক ভেতরে কোথাও তীব্র ভাললাগার নিয়ন্ত্রনহীন উল্কাপাৎ শুরু হল কিন্তু তাদের উৎস আর গন্তব্য কোথায় তা ওর জানা নেই । জানার আগ্রহও খুব একটা অনুভব করতে পারছে না। তবে ওর ধারনা হয়ত এই অনুভুতিগুলোর প্রত্যেকটা সদস্য বহুকাল এমন উল্কাপাতের অপেক্ষায় ছিল। তারপরও ঠিক এই মুহূর্তে ওর কি করা উচিৎ সে প্রস্তুতি ওর ছিল না।

তোমাকে বাসায় পাব এটা আশা করিনি, আজ তোমার ইউনিভার্সিটি নেই?

ত্রিরঞ্জনের এই বাস্তব ও সাবলীল প্রস্নে খুব দ্রুত ঢেউ নিজেকে ফিরে পেল বাস্তবতায়। আজ আমার কোনও ক্লাস নেই ত্রিরঞ্জনদা। কিন্তু এত সকালে আপনি, তা-ও ফুল হাতে? আমি কি স্বপ্ন দেখছি? দাড়ান, নিজেকে একটু চিমটি কেটে দেখি।

ঢেউ এর এই কথায় ত্রিরঞ্জন একটু প্রস্তুত হয়ে গেল। আসলে ফুল নিয়ে আসব ভেবে কিনিনি। আসাদ গেটের সামনে দিয়ে আসবার সময় হঠাৎ মনে হল তোমার জন্য কিছু ফুল নিয়ে আসি। ড্রয়িংরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে ফুলগুলো দিল ওকে ত্রিরঞ্জন।

থাঙ্ক ইউ ত্রিরঞ্জনদা। অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনি কিভাবে জানেন যে রজনীগন্ধা আমার ভীষণ প্রিয়! ফ্লাওয়ার ভাসে ফুলগুলো সাজিয়ে রাখতে রাখতে ঢেউ জিজ্ঞাসা করল, নিশ্চই কোনও কাজে?

ত্রিরঞ্জন একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলে, বলল কাজ ছাড়া কি আমি আসি না তোমাদের এখানে?
হ্যাঁ আসেন, তবে ভাইয়ার সাথে আড্ড দেওয়ার জন্য। নাকি আজ আমার সাথে আড্ডা দেওয়ার জন্য এসেছেন?

আমি তোমার সাথে আড্ডা দেব বলেই এসেছি। আসলে তেমন কিছু করার নেই আজকে আর তাছাড়া আমার কিছু কথা তোমাকে বলা দরকার।

তাই বলেন! মনে মনে ভাবল ত্রিরঞ্জনদারও কি ওর মতন এমন কোনও অনুভুতি হয় ইদানিং! কেন যেন এই প্রথম একটু সংকোচ বোধ করল ও।

একটু অসহায় ভাবে ত্রিরঞ্জন বলল, ঠিক কিভাবে তোমাকে ব্যাপারটা বলব বুঝতে পারছি না ঢেউ। মনে মনে ভাবল, ঢেউ কি ওর সব কথা বিশ্বাস করবে? যতটুকু ও ঢেউকে চেনে তাতে এটুকু বোঝে যে ও অন্যদের মতন নয়। ওর কথা বিশ্বাস না করলেও, অন্তত কথাগুলো শুনবে খুব মন দিয়ে।

আমি এক কাজ করি ত্রিরঞ্জনদা, চা বানিয়ে নিয়ে আসি। তারপর চা খেতে খেতে শুনব আপনার কথা!

ত্রিরঞ্জন মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। তারপর চুপ করে বসে থাকল ঢেউ আসার অপেক্ষায়।

ঢেউ চলে যেতে ওর মনে হল সময় যেন আর কাটছে না। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকল অনেক্ষন কিন্তু মনে হল সেকেন্ডের কাটাটা নড়ছে না। তবুও বোকার মতন তাকিয়ে থেকে বুঝতে চেষ্টা করছে সে ভুল দেখছে কিনা। এভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কতক্ষন পার হয়েছে বলতে পারবে না। পায়ের শব্দে বুঝতে পারল ঢেউ চলে এসেছে।

ধবধবে সাদা মগে ওর সামনে চা এনে রাখল ঢেউ। ধুমায়িত চায়ের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল পাশে ছোট্ট একটা প্লেটে জেলি মাখানো দুই পিস টোষ্টেড পাউরুটি নিয়ে এসেছে ঢেউ।

এতক্ষনে মনে পড়ল সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি ওর। ঘুম থেকে উঠার পর এই প্রথম খুব ক্ষিধা অনুভব করল। ঢেউ এর দিকে তাকিয়ে একটা বোকার মতন হাসি দিয়ে পাউরুটি নিল ত্রিরঞ্জন।

চুপ করে চা খেতে খেতে ওর খাওয়া দেখল ঢেউ। আপনি আজ নাস্তা খাননি, তাই নিয়ে এলাম পাউরুটি দুটো।

পাউরুটিতে একটা কামড় দিয়ে ত্রিরঞ্জন জানতে চাইল, তুমি কিভাবে জান আমি নাস্তা খায়নি?

আমি জানি আপনি বরাবরই একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠেন, আর আজকে এত সকালে আপনি এসেছেন। নাস্তা না খেয়ে আসাটাই স্বাভাবিক। আমি খুবই দুঃখিত যে আপনাকে কোনও জাদু দেখাতে পারলাম না, বলেই ফিক করে হেসে ফেলল ঢেউ।

ঢেউ এর পর্যবেক্ষন ক্ষমতার প্রশংসা করল ত্রিরঞ্জন। তুমি আসলেই একটা জিনিয়াস! খাওয়া শেষ করে চা এর মগ তুলে নিল ত্রিরঞ্জন।

আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে কিছু নিয়ে খুব চিন্তিত। ঢেউ অনুমান করতে চেষ্টা করছে কি বলতে চায় ওকে ত্রিরঞ্জন। ঢেউ এর নিয়ন্ত্রনহীন অনুভুতিগুলোর কথা কি সে বুঝে ফেলেছে? নাকি ত্রিরঞ্জনের ভেতরেও এমন কিছু হয় ওকে ঘিরে! নিজের অজান্তেই অসম্ভব ভাললাগার একটা পরশ ওকে ঘিরে ধরল।

আসলে কথাগুলো আমার ছবি আঁকাকে কেন্দ্র করে, চায়ে প্রথম চুমুকটা দিয়ে ত্রিরঞ্জন শুরু করল।

ঢেউ একটু অবাক হল প্রথমে, কারন ও একদমই ধারনা করতে পারেনি ছবির ব্যাপারে কথা বলার জন্য আজ এত সকালে এসেছে ত্রিরঞ্জন। মনে মনে একটু স্বস্তি বোধ করল, কারন ও যা ধারনা করেছিল সেরকম কিছু হলে একটু সমস্যায় পড়ে যেত।

তুমিতো জান যে আমি সবসময় ছবি আঁকি না কিংবা বলতে পার আঁকতে পারি না। আমার অবচেতন মনের ভেতর অদ্ভুত কিছু হয়ত হয় আর তখন নিজের অজান্তেই আমি রঙ, ব্রাশ এসব হাতে তুলে নেই। ছবি আঁকার শুরুতেও আমি জানি না যে কি আঁকব কিন্তু কিভাবে যেন একসময় একটা সম্পুর্ন ছবি হয়ে যায়। এসব তুমি সবই জান।

হ্যাঁ! প্রথমে ভাইয়ার কাছে এটা শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম। তবে ভাইয়ার ধারনা আপনি হয়ত আলসেমী করেই আঁকেননা সবসময়।

এই জন্যই ব্যাপারটা মুকুলকে বলার চিন্তা বাদ দিয়েছি। যাইহোক, আমার জীবনের দু’টো ঘটনা আছে যা আমি কোনওদিন কাউকে বলিনি কারন এটা নিয়ে কখনও আমারমনে কোনও অদ্ভুত ভাবনা কিংবা শংকা কাজ করেনি। এমনকি ব্যাপার দুটোর মধ্যে যে একটা মিল আছে, তা-ও বুঝতে পারিনি কখনও।

এরপর চা খেতে খেতে ত্রিরঞ্জন একে একে বলে গেল লাল রঙের কোটপরা মেয়েটার ছবি আর সেই ছোট্ট মায়াবী চোখের ছেলেটার ছবি আঁকার ঘটনা। খেয়াল রাখল যেন কোনও কিছু বাদ না পড়ে। ছবি আঁকার শুরুর সময়টা, তারপর ওর ঘোরের ভেতর চলে যাওয়া, লালকোট পরা মেয়েটা আর মায়াবী চোখের ছেলেটার সাথে ওর অজানা জায়গায় দেখা হওয়া, তাদের হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়া, তারপর ঘোরের ভেতর নিজের অজান্তেই নিঁখুতভাবে ওদের ছবি আঁকা, সবই একে একে ঢেউকে বলে গেল।

একটি বারের জন্যও কোনও প্রশ্ন না করে প্রচন্ড অবাক হয়েই ওর সমস্ত কথা শুনল ঢেউ। ঘটানা দুটো শোনার সময় ঢেউ এর মনে হচ্ছিল ও নিজেই যেন সেখানে উপস্থিত ছিল। সবকিছু যেন পরিস্কার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে।

অনেক্ষন কথা বলার পর ত্রিরঞ্জন একটু হাঁপিয়ে গেল। এক চুমুক পানি খেয়ে তারপর থামল। খুব আগ্রহ নিয়ে এবার অপেক্ষা করতে থাকল ঢেউ কি বলে শোনার জন্য।

…………………. চলবে

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (৮) »

Comments

comments