আমাদের ইংরেজি বিভ্রাট ও ট্রান্সলেশন

0
2169
আমাদের ইংরেজি বিভ্রাট ও ট্রান্সলেশন
Print Friendly, PDF & Email

আমি যখন এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছিলাম, তখনও বাংলাদেশের স্কুল শিক্ষা-ব্যবস্হায় অবজেক্টিভ সিস্টেম, ইন্টেরাক্টিভ টিচিং, প্রবলেম ফোকাসড লার্নিং ইত্যাদি টাইপের আধুনিকায়ন শুরু হয়নি। এখনকার জেনারেশন এসব আধুনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাংলাদেশের শিক্ষা-ব্যবস্হাকে চিনেছে। তাই এসব ছাড়া পড়াশোনা করা এদের কাছে একেবারেই অকল্পনীয়। কিন্তু আমরা এসব কিছুই পাইনি। আমাদের সময়টা ছিলো “পড়বি না মানে!, পড়্ !” টাইপের সময়। আমাদের স্কুল পর্যায়ের শিক্ষা-ব্যবস্হা ভয়াবহ ছিলো। আমার আজকের লেখা সেই সময়ের একটা বিভ্রাটকে নিয়ে … তাই আমি বরং শুরুতেই আমাদের এস এস সি পরীক্ষার ভয়াবহ সেসব অভিজ্ঞতার কিছুটা বলে নেই।

     আমাদের সেই সময়ে যে বিষয়টি নিয়ে মোটামুটি সবারই প্রাথমিক দুঃস্বপ্ন ছিলো, সেটা ছিলো গণিত … আর বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান ফ্রি’ … গণিতের সাথে ফ্রি দুঃস্বপ্ন ছিলো ইলেক্টিভ ম্যাথ। তাই গণিতের জন্য মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা ব্যাচে পড়তে যেতো। আমাদের দেশের অসাধারণ কিছু গাণিতিক প্রতিভা যারা এখন বিশ্বসেরা প্রোগ্রামার, ইন্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী বা অধ্যাপক হয়েছেন, তারা প্রায় সবাই একটা সময়ে (বিশেষ করে নব্বই দশকের আগে) গণিত আর ইলেক্টিভ ম্যাথের ভয়ে দিশেহারা হয়ে ঘুরতেন ব্যাচ থেকে ব্যাচে। আমরা দশ-বারোজন ছাত্র ঠাসাঠাসি করে একটা কামরায় বসতাম, এবং ব্যাচের স্যার বা ম্যাডাম যণ্ত্রের মতো এক নাগাড়ে আমাদেরকে অংক করাতেন। সেসব স্যার বা ম্যাডামরা তখন আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় সেলেব্রিটি ছিলেন। আমাদের সবার মুখে মুখে তাদের গল্প থাকতো। আমরা প্রবল উত্সাহ নিয়ে তাদের আন্চলিক টানে অংক বুঝানোর অনুকরণ করতাম। এরকম আনন্দ করতে করতে কিছুটা অংক শিখেও ফেলতাম। না শিখলেও ক্ষতি নেই …. কারণ সব বন্ধুরা মিলে পড়তাম আর ভাবতাম, “আমি যখন বুঝি নাই, নিশ্চই আর কেউও বুঝে নাই”।

     বুঝে হোক আর না বুঝে হোক, গণিত-ত্রাস কোনোভাবে কেটে যেতো। কারণ ক্লাস নাইন থেকেই আমাদেরকে গণিতের কোচিং করানো হতো। বাংলাদেশের মধ্যবিত্তদের মধ্যে একটা প্রচলিত ধারণা হচ্ছে ‘যে অংক পারে না, তার মাথা মোটা এবং তার জীবনে কিছুই হবে না’। উচ্চবিত্তের ছেলেমেয়েরা আর্টস-কমার্স পড়ে পারিবারিক ব্যবসা বা সম্পত্তি দেখবে, কিন্তু মধ্যবিত্তের ভালো চাকরী পাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে অংকে ভালো করা। আর তাছাড়া অংকে ভালো না করলে পাড়া-মহল্লায় বা পরিবারের মধ্যে মা-বাবার ইজ্জত যাবে। মা-বাবার ইজ্জত রক্ষা করতে হলে গণিতে লেটার মার্ক (আশি বা তার বেশী) পেতেই হবে। এসব কারণে ক্লাস নাইন থেকেই সেটার কোচিং করতে হবে।

     কিন্তু আরেকটা জটিল বিষয়ের কোচিং এতোটা আগে থেকে সাধারণত করানো হতো না … সেটা হচ্ছে ইংরেজি। আমি সরকারী স্কুলের ছাত্র ছিলাম। ইংরেজি নিয়ে আমাদের অবস্হা এমন ছিলো যে শিক্ষাবোর্ডের কারিকুলামে তখন যদি ইংরেজির বদলে গ্রীক পড়ানো হতো, আমাদের কাছে সেটা একই রকম দুর্বোধ্য লাগতো। সেই সময় খুব অল্প কিছু ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল ছিলো। আমাদের ধারণা ছিলো যেসব ছেলেমেয়েরা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ে, তাদের মা-বাবারা মোটামুটি রাজা-বাদশা টাইপের বিত্তবান, আর তাদের শরীরে ভিন্ন একটা গন্ধ। বিদেশ থেকে আসা আত্মীয়-স্বজন তাদের স্যুটকেস খুললে যেমন একটা বিদেশী গন্ধ বের হয়, সেরকম একটা গন্ধ। আমাদেরকে বলা হয়েছিলো যে ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া ছাত্রছাত্রীরা আমাদের তুলনায় অনেক বেশী স্মার্ট, আর ভবিষ্যতে তারাই আমাদেরকে চাকরী-বাকরি দেবে। এর কারণ ছিলো তাদের ইংরেজির দখল, আর আমাদের (সরকারী স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের) ইংরেজির ভয় আর কমি। আমরা বড় হয়ে চাকরী খোঁজার সময় অবশ্য আর তাদের দেখা পাইনি।

     আমার আজকের লেখা আমাদের সেই সময়ের ইংরেজির ভয় আর সেই ভয় থেকে জন্ম নেয়া বিভ্রাটকে নিয়ে। শুরুতেই বলে নেই, আমি আমার অভিজ্ঞতা এবং নিজস্ব উপলব্ধি থেকে কথা বলছি, এবং আমার এসব কথাবার্তাকে জেনারেলাইজড-ভাবে নেয়াটা কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। প্রবাসে আমার অনেক কৃতবিদ্য বন্ধুবান্ধবরা আছেন যারা আমার এই ধরণের কথাবার্তা একেবারেই পছন্দ করেন না। আমি এই ধরণের কথাবার্তা শুরু করলেই তারা বলেন, “এসব আপনি কি বলেন … কই, আমরা তো খুব আগ্রহ নিয়ে পড়তাম! আর সেই সময় তো পড়ালেখার স্বর্ণযুগ ছিলো! আপনি নিজে পড়াশোনায় ফাঁকিবাজি করতেন বা ভয় পেতেন বলে কি এসব বলতে হবে!”তেমনই একজন বন্ধু আমাকে একদিন বললেন, “আপনি ভাই জানেন না … মেট্রিক ক্লাসে আমি অনেক আগ্রহ নিয়ে পড়তাম। ইংরেজি পড়ার সময় আমি শেক্সপিয়ারের ছবি সামনে টাঙিয়ে রেখে পড়তাম। ভূগোল পড়ার সময় কল্পনায় তুন্দ্রা অন্চল দেখতে পেতাম। আফ্রিকার আমাজন নদী স্বপ্নে দেখতাম! সেই নদীতে গোসলও করতাম!”

     তাদের এসব কথা কতোটুকু সত্য তা জানি না, তবে আমার স্মৃতির সাথে একেবারেই বেমানান। আমার জন্য আমাদের সেই সময় পড়ালেখার স্বর্ণযুগ ছিলো না। সেই সময়ের শিক্ষাবোর্ডের দায়িত্বে থাকা শিক্ষাবিদরা ইংরেজির মতো একটা সহজ ও সাবলীল ভাষাকে আমাদের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছিলেন। তাদের তৈরী করা সিলেবাস, শিক্ষা-পদ্ধতি, পরীক্ষা-পদ্ধতি ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার কারণে আমাদের শ্রদ্ধেয় স্কুল-শিক্ষকরাও ইংরেজিকে একটি অস্বস্তিকর বিষয় হিসেবে আমাদের কাছে নিয়ে আসতেন। এস এস সি পরীক্ষা পর্যন্ত আমরা ইংরেজি ভাষার প্রতি চরম অনীহা নিয়ে আর সেই ভাষার ব্যাপারে কোনোরকম ধারণা ছাড়াই পড়তে থাকতাম। আমাদের ইংরেজি শিক্ষার অবলম্বন ছিলো ইংরেজির পাঠ্যবই, গ্রামার বই, নোটবই আর মোটাসোটা আকারের টেস্ট পেপার বই। শিখতে ভুল করলে মোটিভেশন হিসেবে দেয়া হতো বেত্রাঘাত, চপেটাঘাত আর কদুক্তি। আমার বিবেচনায় সেই ধরণের পড়াশোনায় চোদ্দ-পনেরো বছর বয়সী কারও আগ্রহ থাকার কথা না। আমরা প্রবল ঘৃণা, ভীতি আর অনিচ্ছা নিয়ে ইংরেজি পড়তাম, আর প্রতিনিয়ত ভাবতাম এর থেকে কবে নিষ্কৃতি পাবো।

     উদাহরণ দিচ্ছি। ইংরেজির ব্যাচে পড়ার সময় একবার আমি ভিক্ষুকের ইংরেজি শব্দ লিখতে গিয়ে বানান ভুল করে beggerলিখে ফেললাম। আমার শিক্ষক প্রবল প্রতাপে আমাকে বললেন, “আরে ব্যাটা ‘বেগার’ লিখবি ‘বেগের’ লিখছিস কেন ? … বানান কবে শিখবি ? এক্ষুণি ঠিক করে লেখ!” আমি সঠিক বানান লেখার পরে তিনি বললেন, “এখন থেকে আর ‘বেগার’ বলবি না… বানান যেন মনে থাকে, সেই জন্য বলবি, ‘বেগগার’। এই রকম করে বললে বানান মনে থাকবে, বুঝলি… এখন বল আমার সাথে, বেগগার!”

     আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের এই অভিনব বানান-শিক্ষা-পদ্ধতি আমাদের ব্যাচে নতুন একটা ত্রাসের জন্ম দিলো, এবং অল্প সময়ে সেই ত্রাস ভয়াবহ রূপ ধারণ করলো। তাঁর আচার-আচরণে মনে হলো তিনি এই আবিষ্কারে মুগ্ধ ও আপ্লুত। এরপর যখনই কেউ বানান ভুল করে, তিনি সেই শব্দের উচ্চারণ বদলে দেন যেন এরপরে সেই বানান সবার মনে থাকে। কিছুদিনের মধ্যে আমাদের ব্যাচের ছাত্ররা ‘ডিজেল’কে বলতে থাকলো ডাইসেল (Diesel), ‘এজুকেশন’কে বলতে থাকলো এডুকেটিওন (education), ‘কালার’কে বলতে থাকলো কোলআওয়ার (colour),‘কোরাপশন’কে বলতে থাকলো কোররাপটিওন (corruption), ‘ফলস’কে বলতে থাকলো ফলসে (False), ইত্যাদি। ভয়াবহ অবস্হা! … আমরা ইংরেজি ট্রান্সলেশন করছি, আর সেটা মুখে বলছি। মুখে বলার সময় সেটা শুনে মনে হতো আমরা একেবারে ভিন্ন একটা ভাষা বলছি। আমাদের মধ্যে যারা কিছুটা ইংরেজি জানে, তারা প্রচন্ড লজ্জা নিয়ে এসব বলতে থাকলো। বাসায় আমাদের মুখে এসব শব্দের এই ধরণের উচ্চারণ শুনে আমাদের মা-বাবারাও বিভ্রান্ত হলেন। আমার বাবা আমেরিকান কোম্পানীতে চাকরী করতেন, সেই সময়ে রিডার্স ডাইজেস্ট জাতীয় ইংরেজি পত্রিকা পড়তেন। তিনি আমার ইংরেজি উচ্চারণের এই বিবর্তনে অধিক শোকে পাথর হয়ে গেলেন। আমাকে ব্যাচ বদলে অন্য শিক্ষকের কাছে যাওয়ার জন্য তাগাদা দিতে থাকলেন।

     আমরা এই যণ্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দিনরাত প্রার্থনা করতে থাকলাম। এতোগুলো কিশোরের প্রার্থনা বৃথা যাওয়ার কথা না। আমরা নাটকীয়ভাবে সেই যণ্ত্রণা থেকে মুক্তি পেলাম। সেই গল্প বলছি। আমাদের এক বন্ধু সেই স্যারের ব্যাচে ট্রান্সলেশন করছিলো। বাংলাটা ছিলো “আমার কাছে টাকা নেই”। ও বেচারা বানানে একেবারেই কাঁচা ছিলো। ও ‘মানি (money)’ বানানটা ভুল করে ফেললো, এবং ভুল করে যেটা লিখলো সেটা আমি আমার জীবনকালে কখনও দেখিনি। ও লিখলো, I do not have munny.

     আমাদের স্যার ওর উপরে রীতিমতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন। গাধা, আহাম্মক ইত্যাদি বিষেশণে ওকে ভূষিত করে বললেন, “তোর কাছে ‘মুন্নি’ নাই এইটা লিখছোস ক্যান! মুন্নি তোর কে লাগে ?‘মানি’ বানান জানোস না! ‘এম ও এন ই ওয়াই’ … বল … ‘মনি’। এখন থেকে ‘মানি’রে বলবি ‘মনি’ … বল আই ডু নট হ্যাভ ‘মনি’…

     আমার বন্ধু সাথে সাথে বললো, আই ডু নট হ্যাভ মনি।

– গুড। এখন বল, ‘আমি টাকা চাই’, এইটার ইংরেজি কি হবে ?

– আই ওয়ান্ট মনি।

– গুড। ‘আমার টাকার দরকার’, এইটা ?

– আই নীড মনি।

– ভেরী গুড। মনে রাখবি গাধা। এরপরে আবার ‘আই নীড মুন্নি’ বলিস না, বুঝছোস ? … এই মনি, কই রে … আমারে চা দিতে কইলাম মনে নাই!

     এই কথা বলামাত্রই স্যার হঠাত স্তব্ধ হয়ে গেলেন। আমাদের মধ্যেও একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে আসলো। তার কারণ হচ্ছে স্যারের নিজের মেয়ের নাম মনি। মেয়েটা আমাদের কাছাকাছি বয়সের ছিলো, আর তাই আমরা সবাই তার নাম জানতাম। মনিকে চা দেয়ার জন্য ডাকার সাথে সাথে আমরা সবাই চুপচাপ মিটমিট করে হাসতে থাকলাম, আর স্যার একেবারে পাথর হয়ে বসে রইলেন। তখন আর উচ্চারণ বদলানোর উপায় নেই। স্যারের জন্য কিছুটা মায়াও হলো, কারণ তিনি তাঁর ছাত্রকে দিয়ে ‘আই ওয়ান্ট মনি’ আর ‘আই নীড মনি’ বেশ জোরেসোরেই বলিয়েছেন। পর্দার ওপাশে থাকা মনি চা বানাতে বানাতে নিশ্চই সেটা শুনেছে।

     এরপর থেকে আর স্যার আমাদেরকে এরকম উচ্চারণ করতে বলতেন না। আমরা সেই উচ্চারণ-বিভীষিকা থেকে রক্ষা পেলাম। আমরা অনেকে ব্যাচ বদলে অন্য স্যারের কাছে পড়তেও চলে গেলাম। তবে সেই স্যারকে (মনির বাবা) দূর থেকে দেখলেই আমরা হৃদয়হীনের মতো নিজেরা বলাবলি করতাম, আই ডু নট হ্যাভ মুন্নি … আরে না না … আই ডু নট হ্যাভ মনি, আই ওয়ান্ট মনি, আই নীড মনি ….

     প্রবাসে পড়াশোনা করতে আসার পরে একটা ব্যাপার বুঝলাম … আমাদেরকে যেভাবে ইংরেজি শেখানো হয়েছিলো, ভাষা হিসেবে ইংরেজি একেবারেই সেরকম না। ছাব্বিশ অক্ষরের এই ভাষা খুবই সহজ আর সাবলীল একটা ভাষা, আর এই ভাষায় শব্দের ভিন্নমাত্রার প্রয়োগ কোনো গ্রামার বই থেকে শেখা যায় না। আমাকে যেভাবে ইংরেজি ট্রান্সলেশন শেখানো হয়েছিলো, সেভাবে ইংরেজি বলতে থাকলে আমার আর বিলাতে শিক্ষকতা করতে হতো না। এখানে ইংরেজি কথোপকথন খুব অদ্ভূতভাবে এবং হালকাভাবে করা হয়। আবারও উদাহরণ দিচ্ছি। অর্থনীতির একটা কনফারেন্সে গিয়েছি, এবং কী-নোট স্পীকারের কথা শুনছি। একজন বিশ্বসেরা নোবেল-বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অর্থনৈতিক মন্দা ও বিনিয়োগের উপরে ঝাড়া চল্লিশ মিনিট বক্তৃতা দিলেন। এরপরে কনফারেন্সের আয়োজক মন্চে উঠে ইংরেজিতে বললেন, “thank you for your seemingly tiring but utterly useful speech”। সাদা বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় “আপনার আপাতদৃষ্টিতে ক্লান্তিকর কিন্তু নিতান্তই উপযোগী বক্তৃতার জন্য ধন্যবাদ”।

     আমি তার কথা শুনে ভাবলাম, “হায় হায়, বলে কি এই লোক! সবাই তো এরে ধরে পিটাবে”! কিন্তু সেরকম কিছুই হলো না। হলভর্তি মানুষ হো হো করে হেসে ফেললো। এমনকি সেই নোবেল-বিজয়ী বক্তাও হেসে ফেললেন। আমি অবাক হয়ে বসে বসে ভাবলাম, কোন শব্দ কিভাবে কোথায় প্রয়োগ করতে হবে, সেটা আমরা কিছুই জানি না। আমি নিশ্চিত যে আমি যদি এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে অন্য কোথাও “টায়ারিং” শব্দটা ব্যবহার করি, আমি ধরা খাবো। কারণ আমার ধারণা ইংরেজি কোন শব্দ কোথায় কিভাবে প্রয়োগ করতে হবে, সেটা আমরা কখনও শিখিনি। একটা ভাবকে কতো ভিন্ন উপায়ে প্রকাশ করা যায়, সেটা আমরা কখনও শিখিনি। আমরা শিখেছি নির্দিষ্ট কিছু ট্রান্সলেশন, কম্প্রিহেনশন, এসে, প্যারাগ্রাফ, ইত্যাদি। সেসবও আমরা শিখেছি একটা বাঁধাধরা উত্স থেকে (নোটবই, গ্রামার বই, এসে বই, টেক্সটবই ইত্যাদি)। আমাদেরকে ধারণা দেয়া হয়েছিলো যে এর বাইরে ইংরেজির কিছু নেই।

     ইংরেজি আমাদের ভাষা নয় … তাই হয় তো আমাদের এতো বিষদভাবে এটা শেখার কথা না। তবে শিক্ষা-পদ্ধতির আধুনিকায়নে ইংরেজি শিক্ষাকে আরো আকর্ষণীয় এবং ব্যবহার্য করা সম্ভব। হয় তো এখন সেটা হচ্ছে। এখন ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের ধুম লেগেছে, যেখানে ইন্টেরাক্টিভ টিচিং, প্রবলেম ফোকাসড লার্নিং ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদেরকে ইংরেজিতে পারদর্শী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। আমাদের জেনারেশনের ইংরেজির দূরাবস্হার কারণে এখনকার সচেতন মা-বাবারা অনেকেই তাদের সন্তানদেরকে ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পাঠাচ্ছেন। আর সন্তানকে ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ানো এখন স্ট্যাটাস সিম্বলও হয়ে গেছে। বিশ্বমানের ইংরেজি শেখানোর জন্য এসব ছেলেমেয়েদের অনেককেই স্কুল এবং পরিবারের মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলা সাহিত্য, বাংলা সংস্কৃতি, বাংলা চলচ্চিত্র, বাংলা শিল্প এবং সর্বোপরি বাঙালিয়ানা থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। এসব ছেলেমেয়েদের অনেকেই বাংলা পড়তে পারে না, বা পারে কিন্তু আগ্রহী না, বা স্বীকার করতে চায় না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে আমাদের তরুণ সমাজের অনেক বড় একটা অংশ তাই এখন বাংলা সাহিত্য, বাংলা সংস্কৃতি, বাংলা গান-নাটক-চলচ্চিত্র এবং বাঙালিয়ানা থেকে দূরে চলে গেছে।

     সম্প্রতি আমার সাথে একজন তরুণীর কথা হচ্ছিলো, যিনি ইন্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য বাংলাদেশ থেকে বিলাতে এসেছেন, এবং বিলাতে আসার আগে সমস্ত পড়াশোনা বাংলাদেশের ইংরেজি মিডিয়ামে করেছেন। সেই তরুণী কাজী নজরুল ইসলামকে চেনেন না, এবং নজরুল গীতি বলে যে কিছু আছে সেটা তিনি জানেন না। ভাগ্যক্রমে তিনি রবীন্দ্রনাথকে চেনেন, কারণ তিনি “রকিং উইথ রবীন্দ্রনাথ” বা এই জাতীয় একটা মিউজিক এ্যালবাম শুনেছেন, এবং সেই এ্যালবামের কভারে তিনি এই কবি সম্পর্কে কিছু পড়েছেন। বিগত বাইশ বছর বাংলাদেশে জীবনযাপন করার পরও তিনি হূমায়ুন আহমেদকে চেনেন শুধুমাত্র একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে … আর সেটাও “হ্যাঁ হ্যাঁ, আই হার্ড অফ হিম … হি ইজ এ ফিল্মমেকার, রাইট ? “ … ধরণের চেনা। সেই তরুণী ইংরেজি সিনেমা দেখেন, ইংরেজি নভেল ও কবিতা পড়েন। বলিউড সম্পর্কে সব তথ্য তার জানা। অনেক আগ্রহ নিয়ে তিনি অমুক খান, তমুক কাপুর আর ঝমুক খান্নার খুঁটিনাটি নিয়ে আলাপ করছেন। তাদেরকে ঘিরে তার নিজের স্বপ্নের কথা, চাওয়া-পাওয়ার বিতং বর্ণনা করছেন। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, টিভি বা অন্য শোবিজ নিয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই। বরং আমাদের শোবিজ তার কাছে ব্যাঙ্গাত্মক, বিদ্রূপকর, ও তার নিজের ভাষায়, ‘ওহ গড, এম্বারেসিং’।

     এসব মানুষের সাথে আমি বেশীক্ষণ কথা বলতে পারি না। ইংরেজি মিডিয়ামের এসব কারবার দেখলে আমার মনে হয়, ইংরেজি শিক্ষার এই উদ্দেশ্য বা পরিণাম কখনোই সঠিক হতে পারে না। আজকের অভিভাবকরা যদি মনে করেন যে ইংরেজি মিডিয়ামে পড়লে এবং অবাঙালিয়ানার জীবনযাপন করলে তাদের সন্তানদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা এবং আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার নিশ্চিত হবে, তারা মহা ভুল করছেন। বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও বিশ্বমানের ক্যারিয়ারের জন্য জ্ঞান, প্রজ্ঞা, প্রতিভা, দক্ষতা, বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও ব্যক্তিস্বাতণ্ত্রের প্রয়োজন, একটা বিদেশী ভাষার দখল নয়। শুধুমাত্র একটা বিদেশী ভাষা বা সংস্কৃতির দখল ও সেসবের প্রতি অন্ধ প্রেম বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদেরকে এর কোনোটাই এনে দিতে পারবে না। আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব আর ব্যক্তিস্বাতণ্ত্র শুধুমাত্র আমাদের বাংলা ভাষা আর বাঙালিয়ানা আর তার প্রতি আমাদের সম্মান ও প্রেমই এনে দিতে পারবে। সেই কারণেই সরকারী স্কুল-কলেজ আর বাংলা মিডিয়ামে পড়া আমার বন্ধুরা আজকে ইনটেল, মাইক্রোসফট, গুগল, ডুপন্ট, এক্সনের মতো বিশ্বসেরা কোম্পানীগুলোতে শীর্ষস্হানীয় পদে কর্মরত, আর বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যাপনা ও গবেষণারত। আজকের প্রবাসী বাংলাদেশীরা যারা দেশের নাম আন্তজার্তিক পর্যায়ে উজ্জ্বল করছেন, তাদের বেশীরভাগই বাংলা মিডিয়ামে পড়া, এবং বেশীরভাগ আজও খাঁটি বাঙালী। বাংলাদেশে যারা শীর্ষস্হানে রয়েছেন, তারাও ঠিক তাই।

     আমার সহকর্মীদের মধ্যে যারা পূর্ব ইউরোপের, চীন দেশের, জাপানের বা ল্যাটিন আমেরিকার, তাদের ইংরেজি উচ্চারণ আর ভাষার দখল আমাদের মতোই। কিন্তু তারা বিশ্বজয় করছেন। তারা তাদের নিজস্বতায় অনেক গর্বিত। মজার ব্যাপার হচ্ছে খাঁটি ব্রিটিশ ইংরেজরা কিন্তু তাদের দেশের অভিবাসীদের নিজস্বতাকেই বেশী পছন্দ করে। তারা আমার কাছে প্রায়ই বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা আর বাংলা সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চায়, আমাদের ভাষার ইতিহাস, ভাষা সংগ্রাম আর সাহিত্যের ধারা সম্পর্কে জানতে চায়। নজরুল, লালন শাহ, হাসন রাজা আর হূমায়ুন আহমেদ সম্পর্কে জানতে চায়। গ্রামীন ব্যাংক সম্পর্কে জানতে চায়। এই সৌভাগ্য আমরা কোথায় রাখি! দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে আমাদের বাঙালিয়ানা ব্যক্তিস্বাতণ্ত্রের আর নিজস্বতার এই সম্মান বিদেশীরা করে, আর আমাদের আপন কিছু মানুষই করে না। এই দুর্ভাগ্য আর লজ্জা আমরা কোথায় লুকাই!

     আমি বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষার শিক্ষা বা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের বিপক্ষে নই। শুদ্ধ এবং ব্যবহার্য ইংরেজি শেখার প্রয়োজন আছে, গুরুত্ব আছে, এবং আমাদের শিক্ষাব্যবস্হায় এর অনেক ভালো প্রভাবও আছে। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে যে ইংরেজি শিক্ষার ভীতি বা বিভ্রাট, আর সেই থেকে জন্ম নেয়া ইংরেজির প্রতি আমাদের অহেতুক দুর্বলতা হয় তো একদিন আমাদের বাঙালিয়ানাকে বড় কোনো ক্ষতির দিকে নিয়ে যাবে। আজকের ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া তরুণসমাজ একুশে বইমেলায় যায় না, কারণ হিসেবে বলে ধূলা আর মানুষের ভিড়ের কথা। তাদের সাথে বন্ধুত্বের কারণে আরও অনেকেই বইমেলায় যায় না। কিন্তু তারা সবাই ধূলা আর ভিড় উপেক্ষা করে ভারতীয় বা পশ্চিমা পপস্টারদের কনসার্টে যায়, বাণিজ্য-মেলায় যায়, মীনাবাজারে যায়। এদের অনেকে বিদেশে এসে বিদেশীদের সাথে বন্ধুত্ব করার সময় আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য, চলচ্চিত্র আর শিল্পের কোনো প্রতিনিধিত্ব করে না। কারণ এসব সম্পর্কে এদের কোনো ধারণাই নেই। এমনটা চলতে থাকলে আমাদের সামনে ভয়াবহ বিপদ আছে।

     আজকের লেখা শুরু করেছিলাম রম্যভাব নিয়ে, কিন্তু কেন যেন লেখাটা একটু সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে। বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতির প্রতি আমার প্রচন্ড আবেগটা লেখাতে চলে আসে। তবে আজকের লেখা শেষ করবো রম্য দিয়ে। লেখার শেষে আমি আমার নির্বাচিত সেরা দশ ইংরেজি ট্রান্সলেশন দিচ্ছি। এসব ট্রান্সলেশন আমরা আমাদের এস এস সি-র সময় করতাম। তবে আজকে আমি সেই মুখস্হ করা ‘সঠিক’ ট্রান্সলেশন দিবো না। লেখাতে এক পর্যায়ে আমি বলেছি যে ইংরেজি একটা চমত্কার সহজ ভাষা, যার মাধ্যমে অনেক ধরণের ভাব প্রকাশ করা যায়। আজকে আমি দিচ্ছি সেরা দশ ‘মডার্ন ডে ট্রান্সলেশন’, অর্থ্যাত আজকের সময়ে আমাদের সেই বিখ্যাত ট্রান্সলেশনগুলোর রূপ। আমার দেয়া সেই রূপে যেমন ইংরেজির একটা ভিন্নপ্রয়োগ থাকবে, তেমনই আমাদের আজকের সময়ে সেসব প্রবাদের বা বাক্যের কি ধরণের ভিন্ন অর্থ থাকতে পারে, সেই একটা প্রচেষ্টাও থাকবে।

     লেখা শেষ করার আগে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে নেই। আমরা জীবনে যা কিছুই অর্জন করেছি, তার অনেকাংশের কৃতিত্ব আমাদের শ্রদ্ধেয় স্কুল-শিক্ষকদের। সেই সময়ে তাঁরা অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমাদেরকে যত্ন করে পড়িয়েছেন বলেই আমরা অনেক কিছু শিখেছি। তাঁরা তাঁদের একাগ্রতা, সততা ও উত্সর্জন দিয়ে আমাদেরকে পড়িয়েছেন। সেই জন্য আমরা তাঁদের কাছে চীরকৃতজ্ঞ। আমার লেখায় তাঁদেরকে নিয়ে রম্য করা হলেও তাঁদেরকে অসম্মান করার কোনো উদ্দেশ্য আমার কখনোই ছিলো না। শিক্ষককে সম্মান করার সেই মনুষত্যও তাঁদেরই শিক্ষা। আমি তাঁদের প্রতি আমার অনেক শ্রদ্ধা জানিয়ে আর সেরা দশ মডার্ন ডে ট্রান্সলেশন দিয়ে আজকের লেখা শেষ করছি। সবার জন্য শুভকামনা রইলো।

টপ টেন মডার্ন ডে ট্রান্সলেশন

 ১০. বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।

When politicians are on the streets, we should stay at home.

 ৯. দারিদ্র্য একটি অভিশাপ।

We no longer have a budget for poverty alleviation.

 ৮. আমার জলে কুমীর ডাঙ্গায় বাঘ।

I am a law-abiding peace-loving citizen.

 ৭. চকচক করিলেই সোনা হয় না।

Think carefully before cheating on your wife/husband.

 ৬. আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান।

I just got married for the second time.

 ৫. স্টেশনে আসিবার পূর্বে ট্রেন ছাড়িয়া দিলো।

I will not marry until I find Ms./Mr. perfect.

 ৪. মানুষ দাঁত থাকিতে দাঁতের মর্যাদা বুঝে না।

The loudest patriots always live abroad.

 ৩. বাড়ি থেকে নদী দেখা যায়।

My neighbour Nodi’s bedroom is just across my window.

 ২. ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মরিয়া গেলো।

The doctor works for NHS UK.

 ১. মানুষ মাত্রই ভুল।

I am always right.

আরও জানুন » দেশী ফ্লেভারে ব্রিটিশ সাইন »

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো তা আমাদেরকে অবশ্যই জানাবেন। আপনার মতামত আমাদের কাছে খুবই মূল্যবান। আপনি যদি আপনার নিজের লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ বা অন্য যেকোনো বিষয় বাঙালিয়ানা Magazine এ প্রকাশ করতে চান, তবে আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে আপনার লেখা প্রকাশে সচেষ্ট হব । আগ্রহীদের এই ইমেইল ঠিকানায় bangalianamagazine@gmail.com যোগাযোগের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হল । Copy করা কোন লেখা পাঠাবেন না। দয়া করে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, আপনার পাঠানো লেখাটি অনলাইনে আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। যদি অনলাইনে আগে অন্য কোথাও আপনার লেখাটি প্রকাশিত হয়ে থাকে, তাহলে আমরা সেটা প্রকাশ করতে পারব না। আমরা অরাজনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক এবং নিরপেক্ষ।
বিঃ দ্রঃ লেখাটি কোনরকম পরিমার্জন ব্যতিরেকে সম্পুর্ণ লেখকের ভাষায় প্রকাশিত হল। লেখকের মতামত, চরিত্র এবং শব্দ-চয়ন সম্পুর্ণই লেখকের নিজস্ব । বাঙালিয়ানা Magazine প্রকাশিত কোন লেখা, ছবি, মন্তব্যের দায়দায়িত্ব বাঙালিয়ানা Magazine কর্তৃপক্ষ বহন করবে না।

Comments

comments